আজ সোমবার, ২০ নভেম্বর ২০১৭, ০৭:২৯ অপরাহ্ন logo

বৃহস্পতিবার, ২৫ Jun ২০১৫, ০৪:১৬ অপরাহ্ন

অফিস বা কারখানায় কাজ করার সুযোগ পায় না মেয়েরা

ছবি : মাহফুজ কল্প

শানু মোস্তাফিজ,

জনতার নিউজ২৪ ডটকম :

রোদে পোড়া শরীর আর পরনের মলিন সাদা থান দেখেই মনে হয় দৃপ্তি চাষার (৫৪) জীবনটা অন্য চা শ্রমিকদের চেয়ে আরেকটু বেশি সংগ্রামের। কথা বলার সময় তার হিসেব-নিকেশ দেখে মনে হয়, নেতৃত্বের গুণেই তিনি পাতি সর্দারণী হয়েছেন। প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার জুরি ভ্যালির কাপনাপাহাড় চা বাগানে পাতি সর্দারণী (স্থায়ী) হিসেবে কাজ করছেন। থাকেন ঐ বাগানের টিলাবাড়ি লেবার লাইনে। দৃপ্তি ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা চাষা সম্প্রদায়ের মানুষ।  
উঁচু-নিচু টিলা এবং সমতল দুই ধরনের জায়গায় কাপনাপাহাড় চা বাগানটি অবস্থিত। সাধারণত চা বাগানে চা পাতা তোলার কাজটি নারীরাই করে থাকে। এর বাইরে তেমন কোনো কাজে তাদের দেখা যায় না। অন্য কাজে তাদের যোগ্যতা আছে বলে গণ্য করাও হয় না। এরপরও সংগ্রামী ও কর্মঠ কেউ-কেউ থাকেন। যাদের প্রচলিত নিয়মে আটকে রাখা কঠিন। দৃপ্তিও এরকম একজন নারী। যিনি প্রমাণ করেছেন এ নিয়মের বাইরে বেরিয়ে আসার যোগ্যতা তার রয়েছে এবং তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে তার দায়িত্বপালন করে যাচ্ছেন।   
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুব কম চা বাগানে পাতি সর্দারণী পদে স্থায়ীভাবে কাজ করেন নারীরা। দ’ু-চারজন থাকলেও তা অস্থায়ী ভিত্তিতে বলে জানা যায়। দৃপ্তি এই স্বল্পসংখ্যক নারী সর্দারণীর মধ্যে একজন। তিনি বলেন, ‘প্রায় ৩০ বছর ধরে এই বাগানে পাতা তোলার কাজ করেছি। এরপর আমার আচরণ, কাজ এবং দক্ষতা দেখে কর্তৃপক্ষ আমাকে এ কাজের সুযোগ দেন।’ দৃপ্তি না বললেও বোঝা যায়, বিষয়টি তত সহজ নয়। কেননা চা বাগানগুলোতে নারীদের নেতৃত্বমূলক বা গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে কাজ করতে দেখা যায় না। খানিকটা সাহস করেই তিনি আরো বলেন, ‘বাগানে মেয়েদের জন্য ভালো কিছু করা তত সহজ নয়। এখন অনেক মেয়েই পড়ালেখা শিখছে। বাগানে পড়ালেখা জানা মেয়ের সংখ্যাও অনেক। তারা চাইলেও বাগানের অফিস কিংবা কারখানায় কাজ করার সুযোগ পান না।’
খুব ভোরেই ঘুম থেকে ওঠে দৃপ্তিকে সংসার এবং চা বাগানের কাজের জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। পরিবার এবং নিজের জন্য খাবারের আয়োজন করতে হয়। ঘর-দোর উঠোন পরিষ্কর করতে হয়। চা বাগানে দুপুরে খাওয়ার জন্যও রুটি তৈরি করতে হয়। এরপর সকাল নয়টার আগেই তিনি বাগানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। হেঁটেই পাড়ি দিতে হয় তাকে প্রায় মাইলখানেক পথ। তিনি বলেন, ‘চা বাগানে ৯টা-৫টা কাজ করা অনেক কঠিন। কেননা বাগানে সবসময় রোদ-বৃষ্টিতে ঘুরে-ঘুরে হেঁটেই কাজ দেখা শোনা করতে হয়। এটা কোনো সহজ কাজ নয়। এতে অনেক পরিশ্রম হয়।’
দারিদ্য এবং কাছাকাছি স্কুল না থাকার কারণে দৃপ্তির পড়ালেখা করার সুযোগ হয়নি। তবে বাগানে কাজ করতে এসে তিনি নাম দস্তখত করা শিখেছেন। ১৮ বছর বয়সে একজন চা শ্রমিকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। চারটা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে রেখে প্রায় ৩০ বছর আগে তার স্বামী যক্ষ্মা রোগে মারা যান। এতে দৃপ্তি দিশেহারা হয়ে পড়েন। ভাবেন কীভাবে সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকবেন। কেননা তার কোনো সম্বল ছিল না। ঐ সময় শুধু চা বাগানের পাতা তোলার কাজটিই তার একমাত্র আশার আলো হিসেবে পথ দেখিয়েছে।
দৃপ্তি বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর আমার একার রোজগারে একটি মেয়ে, একটি শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলেসহ তিন ছেলে নিয়ে আমি যেন অকুল পাথারে পড়ে যাই। ঠিকভাবে সংসার চালাতে না পেরে দিনের পর দিন খেয়ে না খেয়ে থেকেছি। তখন মজুরিও কম ছিল। তাই সন্তানদের নিয়ে টিকে থাকার জন্য আমাকে অনেক খাটতে হয়েছে। কষ্ট করে সেসব দিন পার করলে এখনও আমার সংসারে সচ্ছলতা আসেনি।‘ তিনি আরো বলেন, ‘আমি এখন মাসে ২৩০০ টাকা বেতন পাই। কিন্তুু খরচ হয় এর চেয়ে অনেক বেশি। ছেলেরা বড় হয়েছে। তাদের আলাদা ঘর প্রয়োজন। দিতে পারছি না। ঋণ করে চলতে হয়। জিনিসপত্রের দামও বেশি। আমি কাজ অনুযায়ী বেতন পাই না।’
স্বামীর কাজের সূত্রে দৃপ্তি লেবারলাইনে (চা বাগানের কাছাকাছি যেখানে চা শ্রমিকরা বাস করেন সেটাকে লেবারলাইন বলে) একটি ঘর পেয়েছেন। সেই একটি ঘরেই তার সন্তানদের নিয়ে তিনি বাস করেন। চা বাগানে এভাবেই বংশ পরম্পরা জীবন কাটিয়ে দেন শ্রমিকরা।
এরপরও বলা যায় দৃপ্তি সফল। তার পদোন্নতি হয়েছে। চা বাগানে এ ধরনের পদোন্নতি অনেক কমই দেখা যায়। দৃপ্তির সংগ্রাম এবং যোগ্যতা চা বাগানের নারীদের নিঃসন্দেহে উদ্বুদ্ধ করে। এতে অনেকেই উৎসাহিত হন। এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পান। দৃপ্তি বলেন, ‘নারীরা ঠিকভাবে কাজ করে তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করলে যত বাধাই থাক না কেন একসময় এর মূল্য পাওয়া যায়।’   
 ঐ বাগানে দৃপ্তি ছাড়াও আর একজন পাতি সর্দারণী অস্থায়ীভাবে কাজ করছেন। কিন্তু দৃপ্তির কাজ বেশি। তিনি প্রতিদিন প্রায় ২০০ পাত্তিওয়ালির (যারা চাপাতা তোলে) দেখাশোনা করেন। তাদের পাতা তোলার জন্য চা গাছের লাইন (পাহি) ভাগ করে দেন। প্রত্যেকের কাছে গিয়ে তাদের কাজ তদারকি করেন। দৃপ্তি বলেন ‘এটা খুব সহজ কাজ নয়। কেননা পাত্তিওয়ালিদের ঠিকভাবে দেখাশোনা করতে হয়। অনেক সময় তাদের অনেকেই আরো বেশি কাজ পেতে চান। আবার কেউ-কেউ কাজে ফাঁকিও দেন। এসব নিয়ে তাদের মাঝে ঝগড়া হয়। সেসব আমাকেই মিটমাট করতে হয়।’
 তিনি আরো বলেন, ‘চা পাতার গুণগত মান নির্ভর করে পাতা তোলার ওপর। এজন্য হাত দিয়ে নিয়ম অনুযায়ী পাতা তুলতে হয়। অনেক সময় পাতার গোড়া শক্ত হওয়ায় কেউ-কেউ কাঁচি দিয়ে পাতা কেটে নেন। এটা ঠিক নয়। তাই এসব বিষয় আমাকে ভালোভাবে নজরদারি করতে হয়।’ এগুলো ঠিকভাবে খেয়াল রাখা এবং টিলাবাবুকে জানানো তার কাজ। তাদের অসুখ-বিসুখ কিংবা যে কোনো সুবিধা-অসুবিধাও দেখতে হয় তাকে।    
কিন্তু তার নিজের অসুবিধাও কম নয়। তার মজবুত কর্মক্ষম শরীর দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। সচেতন বলে ডাক্তারের পরামর্শে তিনি নিয়মিত ওষুধ খান। সুস্থ থাকার চেষ্টা করেন। চা বাগানের নারীদের মধ্যে এই সচেতনতাও বিরল। দৃপ্তি বলেন, ‘সুস্থ না থাকলে কাজ করব কীভাবে? জীবনে নানারকম সমস্যা থাকবে। এর মধ্যে ভালো থাকতে হয়। চা বাগানে অনেকেই জানে না তাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। শুধু মজুরি নয়, অনেক বিষয়ে আমাদের সচেতনতা কম। এজন্য আমরা নিজেদের এগিয়ে নিতে পারি না।’
দৃপ্তির বাস্তববুদ্ধি এবং উপলব্ধি তার কর্মক্ষেত্রে যেমন সহায়তা করে তেমনি ব্যক্তিগত জীবনকেও ভালোভাবে পরিচালিত করতে সাহায্য করে। তিনি বলেন, ‘শুধু কাজ নয়, জীবনটাকেও সুন্দরভাবে সাজানো প্রয়োজন। তাই সন্তানদের বলি, বেশি সন্তান নেয়ার জন্য আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। তোমরা বুঝেশুনে সংসার গঠন কর।’ দৃপ্তির একথাই প্রমাণ করে শুধু কর্মক্ষেত্রে নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে। যা জীবনকে অনেক সহজ ও সুন্দর করতে সাহায্য করে।