আজ শনিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৭, ০৬:৫৬ পূর্বাহ্ন logo

বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০১৫, ০৬:৩৪ পূর্বাহ্ন

আলোকবর্ষ দূরে

ফয়েজ আহমেদ

প্রচন্ড গরম। শিপনের একটুও কষ্ট হচ্ছে না। একটানা কাজ করে যাচ্ছে। প্রথম প্রথম গরমে নাক দিয়ে রক্ত বের হতো, এখন হয় না। মাকে প্রায়ই চিঠিতে লিখত, ‘কষ্ট হয় মা, দেশে আসতে ইচ্ছে করে।’

অথচ এখানে বর্ষার পানিতে বাড়ির চারপাশ ভরে গেছে। ছেলেটার জন্য মায়েরও খুব কষ্ট হয়। কয়েক বছর আগেও শিপন মাকে অনেক জ্বালিয়েছে। হঠাৎ করে রাত দুপুরে এসে বলতো, ‘মা, মাছ ধরে এনেছি, উঠো, রাঁধতে হবে।’  মা ইচ্ছা রকমে বকতো ওকে। তারপর আস্তে আস্তে উঠে রান্না ঘরে গিয়ে মাছগুলো ভাঁজতো। এরমধ্যে শিপন ছোট বোন শিখাকে জাগাতে যেত, ‘এই শিখা উঠ, মাছ খাবি? বেলে মাছ।’ শিখা মাছের জন্যই হোক আর ভাইয়ের জন্যই হোক এক লাফে উঠে পড়ত।

শিখা ক্লাশ ফাইভে পড়ে। বানান করে ভালো বাংলা বলতে পারে। শুধু যুক্তাক্ষর পড়তে গেলে আকস্মিক কে আকমিক বলে চালিয়ে দেয়। শিপনের দেয়া চিঠিগুলো মা ওকে দিয়েই পড়ায়। মাঝে মাঝে বলে, ‘তোর ভাইয়ের গত মাসের চিঠিটা একটু পড়ে শোনা তো’। শিখা বিরক্ত হয়, এক চিঠি বারবার পড়তে ভালো লাগে না। তাছাড়া চিঠির কথাগুলো শুনে মা শুধু কাঁদতে থাকে। এতে শিখারও কান্না পায়। শিপনের দেয়া অনেকগুলো চিঠি শিখার মুখস্ত প্রায়। যে চিঠিগুলোতে শিখার কথা বেশি লিখেছে সেগুলো শিখার এমনিতেই মুখস্ত হয়ে গেছে।

শিপন বিদেশ যাওয়ার সময় শিখা অজরে কাঁদছিল। কোন কথা বলতে পারছিল না। ‘এই কাঁদছিস কেন আমি তো আর একেবারেই চলে যাচ্ছি না, আমি তো আবার আসব। কাঁদিস্ না শিখা। আর শোন, দুষ্টামি করবি না।’ শিখা মনে মনে  বলে দুষ্টামি তো আমি  করি না, দুষ্টামি তো করো  তুমি। একবার শিখাকে মুরগির মাংস বলে ব্যাঙের মাংস খাইয়েছে। যখন শুনেছে ব্যাঙের মাংস, শিখা বমি করতে করতে অস্থির। ভাইয়ের ওপর শিখার অনেক  রাগ  হতো। আজ কেন যেন  ওর অনেক কষ্ট হচ্ছে। ভাইকে অনেক দিন দেখতে পাবে না। মায়ের মুখ দিয়েও কোন কথা বের হলো না। শুধু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, মাথায় আর পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। এদিকে শিপনের বাবা মহাখুশি। জীবনে কখনও দুঃখ পায়নি। খুশি যে হয়েছে খুব বেশি তাও নয়। ছোট ভাইয়ের জন্য একবার আর এইবার, মোট মিলে দুইবার। দু’বারের  খুশিতেই  জীবনকে ধন্য মনে করেন তিনি। শিখাকে শান্ত করতে গিয়ে নিজেরও খানিকটা  কষ্ট হলো। ইচ্ছে ছিল চাচার মতো করে মানুষ করবে তা আর হলো না। দুবার মেট্রিক ফেল করেছে। তৃতীয়বার আর পরীক্ষা দেয়নি।
২.
ওরা যে ঘরটাতে থাকে এটা একটা টিনের চৌচালা ঘর। চালগুলোর বর্ণ তামাটে হয়ে গেছে। তবুও শিপনের বাবা চাল বদলাচ্ছেন না। এটা তার বাবার ঘর, তাছাড়া ছোটভাই শরিফউদ্দিনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এ চালের সঙ্গে। শরিফউদ্দিনকে ঘরের চালের উপর বসিয়ে রাখা হয়েছে। সারা গ্রামের মানুষ তাকে দেখতে এসেছে। এমনকি দূর পশ্চিমের মোহনপুর থেকেও লোকেরা এসেছে। লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে শরিফউদ্দিন। শিপনের বাবা সবার হাতে হাতে বাতাসা দিচ্ছেন। ভাবছে ঢাকঢোল পিটিয়ে সবাইকে জানাবে কিন্তু তার আর দরকার হলো না। মানুষের মুখেমুখে গ্রাম থেকে গ্রাম চলে গেছে। দল বেঁধে গ্রামের মেয়েরাও দেখতে এসেছে। শুধু এ গ্রাম নয়, দু-দশ গ্রামের মধ্যে এই প্রথম মেট্রিকুলেশন পাস করল শরিফউদ্দিন। বাবা নেই ভাই-ভাবীর সংসারেই থাকে শরিফউদ্দিন। শিপনের তখন জন্ম হয়নি। তারপর শরিফউদ্দিন শহরে চলে যায়, শহর থেকে আর ফেরা হয়নি। শহরের ব্যস্ততা আর জীবনের ব্যস্ততা দু’মিলে আর সময় হয়নি।  শিপন তার চাচাকে দেখেনি শুধু গল্প শুনেছে। গল্প না ঘটনা। গল্পের সত্য-মিথ্যা  হতে পারে, চাচারটা ঘটনা। শিপনের বাবা প্রায় বলতো ‘তোর চাচার মতো এমন একজন এ গ্রামে নেই।’ শিপন মনে মনে ভাবে না থাকলেই ভালো হয়। চাচার প্রতি  একটা রাগ শুধু যে শিপনের তা নয়, শিপনের মায়েরও। রাগ নেই শুধু শিপনের বাবার। আসলে রাগ করার কিছুই নেই। এমন তো কিছুই করেনি যে রাগ করা যায়। কিন্তু শিপনের মায়ের  কথা হলো, ‘একবার হলেও তো দেখা করে যেতে পারত, আমরা কি তার কেউ নই?’

৩.
শীতের সকাল। কুয়াশা বৃষ্টি হয়ে পড়ে। শিপনের মা দক্ষিণের লাউ গাছগুলোতে পানি ঢালতে এসেছেন। আজ কেন যেন হঠাৎ করে ছেলের কথা মনে পড়ল। বুকের ভেতরটা  কান্নায় ভারি হয়ে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। জীবন সংসারের এই দুঃখটাকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি। ডাকপিয়নকে দেখলেই ছুটে গিয়ে বলতেন, ‘শিপনের কোন চিঠি আছে?’ একই কথা বারবার শুনতে পিয়নের ভালো লাগত না। শুধু ‘না’ বলে চলে যেত। এই ‘না’ শব্দটা উচ্চারণ করতে পিয়ন  রহমত আলীর অনেক  কষ্ট হতো। জীবনে শুধু মানুষের চিঠিই বিলি করেনি। মানুষের সুখ-দুঃখের পুরো ভাগটাই দখল করে নিয়েছে। সুখের কথা শুনলে আনন্দে বুকটা ভরে যেত। নিজের চাকরিটাকে সেবা বলে মনে করত। আজ জীবনের হিসাব মেলাতে গিয়ে বড় গরমিল লেগে গেল। শিখা ভাইকে প্রায় ভুলেই গেছে। তার স্মৃতিগুলো কেমন অগোছালো। কিছুক্ষণ মনে থাকে আবার থাকে না। অথচ যখন ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনেছিল, কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। ভাইকে একবার দেখতে চেয়েছিল, কিন্তু তা আর হয়নি। মৃতদেহটি দেশে আনা সম্ভব হয়নি। শিখার একটা কথা খুব মনে পড়ে, ভাই যাওয়ার আগে বলেছিল ‘আমি তো আর একেবারেই চলে যাচ্ছি না, আমি তো আবার আসব’। শিপন ফিরে আসেনি। শিপনের বাবা কখনও দুঃখ পাননি। দুটি কারণে সুখী হয়েছিল। আজ মনে হলো ওই সুখ দুটিই জীবনের বড় দুঃখ। শিখাকে অনেকবার বলেছেন ‘তোর চাচার  কাছে একটা চিঠি লেখ, আমাকে কিছু টাকা পাঠাতে বল, আমি দুটা গরু কিনব আবার চাষাবাদ করব।’ শিখা কখনও চাচাকে দেখেনি চাচার ওপর ওর কোন রাগও ছিল না। আজ চিঠি লিখতে গিয়ে চাচার ওপর অনেক রাগ হলো। বাবার কথামতো গরু কেনার টাকা চায়নি। শুধু লিখেছে-

‘... বাবা আপনাকে দেখতে চেয়েছে, ভালোবাসে  বলেই হয়তো দেখতে চেয়েছে। আমি আপনাকে কখনও দেখেনি;  তাই ভালোবাসাও জন্মায়নি। মানুষকে না দেখলেও ভালোবাসা যায়। আমি আপনাকে ভালোবাসতে পারিনি, ব্যর্থতা কার সেই সমীকরণ কখনও মিলাতে যাব না। ভাইয়াকে হারিয়ে বাবা অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছেন। আপনি এলে বাবা অনেক খুশি হবে।’

লেখা শেষে বাবাকে শোনাল। বাবা বললেন, ‘এমন করে লেখার কী দরকার ছিল। সহজ করে দুটি গরু কেনার টাকা চাইলেই পারতি।’ বাবার চোখ দুটো পানিতে ভরে গেছে। শিখা তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। বাবার চোখের পানি চোখকে অতিক্রম করতে পারেনি। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।

লেখক পরিচিতি :

সাংবাদিক, দৈনিক সংবাদ