আজ সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০১:৩১ পূর্বাহ্ন logo

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ০১:৪৪ অপরাহ্ন

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমাদের মনোজগতের স্থায়ী পরিবর্তন প্রয়োজন

অভিনয়শিল্পী সৈয়দ হাসান ইমাম। মুক্তবুদ্ধিচর্চা আর অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার প্রত্যয়ে সোচ্চার এই ব্যক্তিত্ব ৮০ পেরিয়ে ৮১ তে পার রেখেছেন গত ২৭শে জুলাই ২০১৫ । কথা হয়  দেশের এই সাংস্কৃতিক পুরাধা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে।

আপনার জন্ম দিনকে ঘিরে উৎসব, কেমন লাগছে?

অনেক ভাল লাগছে। ছোটবেলায় কখনও এভাবে জন্মদিন পালিত হয়নি। পারিবারিকভাবেই হয়েছে। আমাকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষেরা এভাবে সম্মান দেখাচ্ছেন, এটা আমি কখনও ভুলতে পারব না।

আপনার অভিনয় জীবনের শুরুটা কিভাবে?

আমার অভিনয় জীবন শুরু হয় ১৯৫০ সালে। আমি তখন ভারতের বর্ধমান কলেজে পড়ি। কলেজের এক বার্ষিক অনুষ্ঠানে একই দিনে দুটো নাটক মঞ্চস্থ হয়। একটি নাটকের নাম ছিল ‘মিশরকুমারী’। এতে আমি নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করি। এছাড়া বিধায়ক ভট্টাচার্যের ‘দায়িত্ব’ নাটকে নায়ক চরিত্রে অভিনয় করি। এরপর থেকেই অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পাই।

আপনিতো গানও করতেন?

বর্ধমানে থাকতেই রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতাম। কোন রকম প্রাতিষ্ঠানিক তালিম ছাড়াই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও স্কুলের প্রতিযোগিতায় গান গাইতাম। এক রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রতিযোগিতায় আমি প্রথম হই। ওই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়। পরে গলায় ফ্যানিনজাইটিস ধরা পড়ায় আর সঙ্গীত চর্চা অব্যাহত রাখতে পারিনি।

দেশে ফিরে কিভাবে অভিনয় শুরু করেন?

আমি ১৯৫৭ সালে দেশে ফিরে আসি। সে সময় ঢাকার গে-ারিয়ার দীননাথ সেন রোডে কিছুদিন বসবাস করি। দেশে ফেরার পর ১৯৬০ সালে রেডিওতে যোগ দিই। একই সঙ্গে মঞ্চেও অভিনয় করতে থাকি। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপনে বাধা দেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। ফুঁসে ওঠে সমগ্র বাংলার মানুষ। আমি তখন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে কর্মরত। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় আন্দোলনে যোগ দিই। তখন ড্রামা সার্কেলের উদ্যোগে ‘তাসের দেশ’, ‘রাজা ও রানী’ ও ‘রক্তকরবী’ নাটকেই প্রধান চরিত্রে আমি অভিনয় করি।

চলচ্চিত্রে অভিনয় সম্পর্কে কিছু বলুন

চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনাও করেছি। আমার অভিনীত দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘রাজা এলো শহরে’, ‘শীত বিকেল’, ‘জানাজানি’, ‘ধারাপাত’ ইত্যাদি। ‘অনেক দিনের চেনা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য পাকিস্তান চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার অর্জন করি।

আপনাদের দাম্পত্য জীবনের ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে

এটাও ভাল লাগার একটি বিষয়। রবীন্দ্রনাথের একটি বাক্য মনে পড়ে যায়, ‘সে আজ হলো কত কাল, তবু যেন মনে হয় সেদিন সকাল’। ১৯৬৫ সালে লায়লার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। আমরা একসঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিম-লে কাজ করি। মানসিক দিক দিয়েও আমরা এক। দু’জনই রবীন্দ্র দর্শনে বিশ্বাসী এবং ভালবাসী। আমাকে সে খুব যত্ন করে, আমিও তার থেকে বিচ্যুত নই।

আপনার দৃষ্টিতে নাট্যসংগঠনগুলো কেমন সক্রিয়?

নাট্যসংগঠনে যখন সক্রিয় ছিলাম, তখন অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে বিটিভির সম্প্রচার পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিলাম আমরা। তখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন এইচএম এরশাদ সাহেব। তিনি আমাকে টেলিফোনে বলেছিলেন আপনারা সম্প্রচার বন্ধ করবেন না। আমি আপনাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে সব সমস্যার সমাধান করব। আমরা অনশন করে বিটিভিতে শিল্পীদের গ্রেড চালু করেছিলাম, অডিশন বোর্ড গঠন করেছিলাম। আমাদের সঙ্গে নাট্যশিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী সবাই যোগ দিয়েছিল। এখন ৮০ বছর বয়সে এসব নিয়ে যদি আমাকে নেতৃত্ব দিতে হয় এটা দুঃখজনক এবং এটা সম্ভবও নয়।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিছু বলুন?

আমার অভিনয় জীবনের ৬২ বছর চলছে। দেশীয় চলচ্চিত্রের কারিগরি দিক দিয়ে আমরা অনেক এগিয়েছি। পৃথিবীতে ভাল চলচ্চিত্র কিন্তু হাতে গোনা কয়েকটি। আমাদের দেশেও তাই। কোন এক সময়ে হলে গিয়েই চলচ্চিত্র দেখতে হতো। এখন চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ বেড়ে গেছে। বাড়িতে বসে বোতাম টিপলেই পৃথিবীর সব দেশের চলচ্চিত্র দেখা যায়। কষ্ট করে হলে গিয়ে  দেখতে চায় না।

সাংস্কৃতিক কর্মীদের উদ্দেশ্যে আপনার বক্তব্য ?

কোন এক সময়ে সারাদেশে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটিয়ে আমরা স্বাধীন একটি ভূখণ্ড পেয়েছি। কিন্তু আমাদের এ বিপ্লব এখনও শেষ হয়নি। এ অসমাপ্ত বিপ্লব চালিয়ে যাওয়ার জন্য আমি সাংস্কৃতিক কর্মীদের আহ্বান জানাই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমাদের মনোজগতের স্থায়ী পরিবর্তন প্রয়োজন।