আজ রবিবার, ২৩ Jul ২০১৭, ০৬:৫৩ পূর্বাহ্ন logo

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ১০:১৮ অপরাহ্ন

সরকার যদি চায় তাহলে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে-সোহেল রানা

দেশীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী শিল্পী মাসুদ  পারভেজ। চলচ্চিত্রাঙ্গণে যিনি  সোহেল  রানা নামেই বেশি পরিচিত। তিনি একাধারে প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা। বহুমাত্রিকতায় চলচ্চিত্রাঙ্গণকে এখনও রেখেছেন আলোকিত। জনতার নিউজের পক্ষ থেকে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন- সামছুল হুদা।

ঈদ কিভাবে কাটাবেন?
সোহেল রানা: এবার ঈদে আমার তেমন একটা ব্যস্ততা নেই। আমি সাধারণত ব্যস্ত আছি সাংবাদিকদের অসাংবাদিকতা নিয়ে। এই কারণের জন্য যে , একজন সাংবাদিকের দায়-দায়িত্ব হচ্ছে একটা সংবাদকে পরিবেশন করা। তারপর সংবাদের সঠিক দিক এবং ভুল দিক দুটুকেই মানুষের সামনে তুলে ধরা। মানুষ বিচার করবে কোনটা ভালো কোনটা মন্দ । কিন্তু ইদানিং কালে হচ্ছে টেলিভিশনের টক-শো থেকে শুরু করে পত্রিকায় বলা হচ্ছে ব্লগারদের হত্যা করা হচ্ছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে যে ব্লগারদের খুন করা হচ্ছে , এই ব্লগার কি ?ব্লগার কারা? চাপাতি দিয়ে খুন করা হচ্ছে, কুপিয়ে খুন করা হচ্ছে এই সব কিছুই অনেক সুন্দর ভাবে লিখা হচ্ছে , কিন্তু মুক্তমনা বলে তারা কি লিখছেন সেটাতো আমি জানতে পারছিনা। প্রশ্ন হচ্ছে এই মুক্তমনারা কি এমন লিখছে যে তাদের কুপিয়ে মারা হচ্ছে। কুপিয়ে মানুষ হত্যা করাটা কখনও মনুষ্যত্বের পর্যায়ে পড়েনা। কিন্তু কিছু কিছু  সময় জীবনের প্রয়োজনে না ধর্মীয় প্রয়োজনে প্রত্যেক ধর্ম গ্রন্থে  বলেছে তুমি ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং তোমার  সৃষ্টিকর্তার নাম রক্ষা করার জন্য তুমি যুদ্ধ করতে পারো। এখন মুক্তমনা শব্দের অর্থ কি আমি এখনো বুঝতে পারছিনা। কারণ কোন সাংবাদিকই উল্লেখ করছেনা মুক্তমনা বিষয়টা আসলে কী? আমি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই যে, তিনি বলেছেন মুক্তমনার কথা বলে অন্য ধর্মকে হেয় প্রতিপন্ন করা বর্তমান সরকার বরদাস্ত করবেনা। সাথে সাথে আমার মনে প্রশ্ন জাগছে যে, মুক্তমনারা কি তাহলে অন্যের ধর্ম নিয়ে বাজে কিছু বলছে। একজন মানুষ হিসেবে তুমি নাস্তিক হতে পারো । তবে তোমার মত্যুর পর তুমিই জবাব দিবে। তাই বলে তুমি  অন্যের ধর্ম নিয়ে কথা বলতে পারোনা। তাই আমি জানতে চাই মুক্তমনারা কি লিখছে এবং সেটা সম্পর্কে যখন সাংবাদিকরা জানাচ্ছেনা তখন সেটা আমাকে ভাবাচ্ছে। এটাই এখন আমার কাজ । আমি প্রধানমন্ত্রীর কথার উপর অনুমান করে ভিত্তি করে বলছি। সাংবাদিকরা কেন এটা লিখছেনা ? সাংবাদিকদের দায়-দায়িত্ব হচ্ছে কারো মুখপাত্র না হয়ে কাজ করা। সাংবাদিকরা নিউজ করলে সেটা যেন কোন পক্ষপাতিত্ব না হয় ।  আমি শুধু এগুলো নিয়েই ভাবছি । এগুলোই আমাকে ভাবাচ্ছে।

দর্শকরা এখন হলমুখী হচ্ছে না কেন ?
সোহেল রানা: মা যদি একটা ছেলেকে খুন করতে চায় তাহলে সেই ছেলেকে বাঁচাতে পারে কে ?  কেউ পারেনা। সরকার যদি চায় তাহলে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।
আজকে ৪২ বছরে ৪২ জন এমডি পরিবর্তন হয়েছে। এই ৪২ জন এমডি’র মধ্যে একজনও ফিল্ম থেকে যায়নি। আমি মানলাম তারা খুবই ভালো লোক । তারা খুবই বুদ্ধিমান । কিন্তু তারা ফিল্মের কি বোঝে?
 
দেশীয়  চলচ্চিত্রের বর্তমার অবস্থা কেমন  মনে হয়?
সোহেল রানা: ফিল্ম আর টেলিফিল্মের মধ্যে সময় ছাড়া তো কোন তফাৎ নেই। টেলিফিল্মের মধ্যে ৩টা গান ৩টা নাচ যোগ করে দিলেই তো ফিল্ম হয়ে যায়। মানসম্পন্ন ফিল্ম আর টেলিফিল্ম না বানাতে পারাটা অন্য ব্যাপার। যেসব ছেলেরা এখন ফিল্ম বানাচ্ছে তাদের তো এখন আর আগের মত প্রসেস করতে হয়না।

চলচ্চিত্রে নায়ক-নায়িকার সংকটের কারন কি ?
সোহেল রানা: যেসব নতুন নায়ক-নায়িকা এখন আসছে তারা তো এখন ছবি করার আগেই সাংবাদিকরা তাদের সুপারস্টার বানিয়ে দিচ্ছে। কারন তারা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যোগ দেওয়ার আগেই পত্রিকা ও রিয়েলিটি-শো’র সুবাদে সুপারস্টারের খেতাব পেয়ে যায়। সময় ব্যয় না করে বিনা পরিশ্রমে সুপারস্টারের তকমা লাগাতে সক্ষম হয় বলে এরা বেশী দিন টিকেও থাকতে পারেনা। উড়ে এসে জুুড়ে বসে তারা নিজেদেরকে স্টার ভাবতে শুরু করে এবং উচ্চ পারিশ্রমিকও হাঁকায়। স্টারইজম অর্জন করাটা কত কষ্টের এটা যদি তারা জানতো তাহলে নিজেদের সম্বন্ধে তাদের একটা ধারনা তৈরি হতো। এখন যারা নিজেদেরকে তারকা ভাবে আসলে তারা নিজেদের সম্বন্ধে জানেইনা তারা কী? তারা চলচ্চিত্রে এসেই বলা শুরু করে আমাকে এতো টাকা না দিলে আমি কাজ করবোনা। আর করবেই বা কেন? কারন সেতো আগেই সুপারস্টার হয়ে গাড়ি পেয়ে গেছে। এখানে এসে কি করবে? তাকে যদি বলা হয় তোমাকে বড় একজন পরিচালকের সাথে কাজ কর তোমাকে শিখতে হবে, চড় খেতে হবে সে আর বড় পরিচালকের সাথে কাজ করবেনা। সে কাজ করা শুরু করবে নতুন পরিচালকের সাথে। আগে হিরো-হিরোইনদেরতো ভালো ভাবে ট্রেইন্ড-আপ করা হত, এমনকি সেটেও চড় মারা হয়েছে , টাকা তো অনেক দূরের কথা। আগে ফিল্মের অ আ শিখ । আর এখনতো দেখি দুইদিন এসেই তার গাড়ি হয়ে গেছে, বাড়ি হয়ে গেছে। তারা টাকার পেছনে ঘুরতেছে। তারা ছবিতে যতটা না সময় দিচ্ছে, তার চেয়ে  বেশি সময় দিচ্ছে লংড্রাইভে , বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে কফি পার্লারে।

আপনিতো একই সাথে প্রযোজক, পরিচালক এবং অভিনেতা। কোনটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করেন?
সোহেল রানা: সব জায়গায় আমি কাজ করতে আমি স্বাচ্ছন্দবোধ করি। আমার লেখা  বই ৪০ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি আমার ছবির জন্য ৩ টা ছবির গল্প লিখেছিলাম। আর কোন গল্প লিখিনি। কারন তখন দেখলাম আমি সেখানে  স্বাচ্ছন্দবোধ করতে পারছিলামনা। প্রযোজক হিসেবে স্বাচ্ছন্দবোধ করার তো কিছুই নেই। গল্প পছন্দ হলেই টাকা । আর পরিচালক হিসেবে আমি আমার ছবি এবং আমার ভাইদের ছবির পরিচালক ছিলাম। তাই  অস্বাচ্ছন্দবোধের কিছু নেই । আর অভিনয়ের ব্যাপারটা হলো, আমি যতক্ষণ পর্যন্ত আমার মন মতো চরিত্র না পাই,ততক্ষন পর্যন্ত আমি কাজ করি না।  তাই যখন আমার চরিত্র ভালো লাগে আমি কাজ করতে তখনি স্বাচ্ছন্দবোধ করি।

আপনার ভবিষৎ পরিকল্পনা কি?
সোহেল রানা: পরিকল্পনা আমি কখনোই করিনা। তবে আমি ধারনা করি। আল্লাহ্তায়ালা যদি আমাকে সময় দেয় তাহলে আমি আমার দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে চাই। কারন আমি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। তাই আমি একটা রাজনৈতিক পার্টির সাথে সম্পর্কিত । ভবিষ্যতে সরকার যদি চলচ্চিত্রকে বাঁচিয়ে রাখার কোন আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহন করে তখন চলচ্চিত্রের মানুষ হিসেবে চলচ্চিত্রের সেবা ও উন্নয়নে কাজ করে যাবো।
আমি চাই আমার মৃত্যুর পর দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবাই যেন বলে মাসুদ পারভেজ লোকটি খুব ভালো ছিল। দর্শকদের ভালোবাসার কারনেই আজ আমি এ অবস্থানে আসতে সক্ষম হয়েছি। দর্শকরাই আমার সকল কাজের অনুপ্রেরনা। যার কারনে তাদের কাছে আমার ঋনের কোন শেষ নেই। দর্শকদের ভালাবাসায় আজীবন আবদ্ধ থাকতে চাই।
   
আপনার ২৫ বছর দাম্পত্য জীবনের অনুভূতি কেমন?
সোহেল রানা: অন্যকে সুখী করতে পারলে তুমি সুখী। আমি সুখী যদি আমার স্ত্রীকে সুখে রাখতে পারি। জীবনে সুখও পেয়েছি আবার অনেক সময় দুঃখও পেয়েছি। তিল থেকে খৈলই হবে তা হয়নি। অনেক সময় তিলের সাথে  খৈলের পরিবর্তে বালুও চলে আসে। কাজেই এই ২৫ বছর অনেক চড়াই-উতরাই  পেরিয়ে বহতা নদীর মতো বয়ে চলছে আমার দাম্পত্য জীবন। এই ২৫ বছরে আমি সুখ,দুঃখ,হতাশা,আনন্দ,বেদনা, ভালোবাসা সব নিয়ে কাটিয়েছি।

ডিজিটাল  চলচ্চিত্র সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?
সোহেল রানা: ছবি বানানো হচ্ছে ডিজিটালে কিন্তু ছবি চলছে এনালগ মেশিনে। ডিজিটাল ছবির সাউন্ডওতো ডিজিটাল , সেই ছবিটা যদি হলে গিয়ে এনালগ সাউন্ড মেশিনে শুনতে হয় তাহলে ছবিটা ডিজিটাল হল কোথায়? তার মানে অর্ধেক ডিজিটাল অর্ধেক এনালগ । তাহলে ছবি কিভাবে ভালো হবে? ডিজিটাল ছবি মানে যে জায়গায় আমি ছবি চালাবো ওই জায়গার মেশিন গুলোওতো ডিজিটালই হতে হবে। ৪/৫টা সিনেমা হল ছাড়া বাকী সবগুলো সিনেমা হলে এখনও এনালগ পদ্ধতি চলছে। এই মেশিন দিয়ে সিনেমা প্রদর্শন করে সেটিকে  ডিজিটাল সিনেমা বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। পর্দা  ও সাউন্ড সিস্টেমই যদি ডিজিটাল না হয় তাহলে সিনেমা কিভাবে ডিজিটাল হবে? ৫ বছর ধরে পর্দা ধোয় হয়নি, পরিস্কার করেনি ময়লার স্তুপ পড়ে আছে , তো সেটার মধ্যে দর্শকরা কি দেখবে। ডিজিটালের কথা বলেতো চুরি করা হচ্ছে। সিনেমাহল আর গোডাউনের মধ্যে পার্থক্য হল সিনেমাহলে মেশিন  আছে,বসার জায়গা আছে, ফ্যান আছে। আর গোডাউনে তো এগুলো থাকবেনা। তাহলে কিছু কিছু হলেতো মেশিনই নেই তাহলে সেগুলোকে সিনেমা হল হিসেবে অনুমতি কেন দিল? একটি কোম্পানি বিভিন্ন হলে মেশিন ভাড়া দিয়ে ৩ বছরে অনেক টাকা নিয়ে নিচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে তাদের প্রত্যেকটা মেশিনের ভাড়া দিতে হয় ১২০০০ হাজার টাকা। আর সেই ১২০০০ টাকাও দিতে হয় প্রযোজককে । এভাবে চলতে থাকলে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি প্রযোজকশুণ্য হতে বেশী সময় লাগবেনা। আর প্রযোজকই যদি না থাকে তাহলে সিনেমা নিয়ে এতো আয়োজনের কোন কিছুই থাকবেনা।