আজ সোমবার, ২১ অগাস্ট ২০১৭, ০৪:৫৮ পূর্বাহ্ন logo

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ০৯:৩৫ পূর্বাহ্ন

পাপমুক্তি ও আত্মশুদ্ধির বাসনায় পবিত্র হজ পালিত

নিউজ ডেস্ক,

জনতার নিউজ২৪ ডটকম :

পাপমুক্তি আর আত্মশুদ্ধির আকুল বাসনায় পবিত্র মক্কা নগরীর অদূরে ‘উকুফে আরাফা’ বা আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের মধ্যদিয়ে বুধবার পবিত্র হজ পালন করেছেন গোটা দুনিয়া থেকে আগত লাখো লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলমান। আরাফাতের পাহাড় ঘেরা ময়দান ছাপিয়ে আকাশ-বাতাস মুখর ও প্রকম্পিত হতে থাকে আবেগাপ্লুত বেশুমার  কণ্ঠের ‘লাব্বাইক আল­াহুম্মা লাব্বাইক, লা-শারিকালাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্ নে’মাতা লাকা ওয়াল মুলক লা শারিকা লাক’-তালবিয়ায়।
 
‘জাবালে রাহমত’ সাদা আর সাদায় একাকার। আদিগন্ত মরু প্রান্তর এক অলৌকিক পুণ্যময়তায় অধিকার করে রাখে। এক অপার্থিব আবহ রচিত হয় পুরো ময়দানে। সবার পরনে সাদা দুই খণ্ড বস্ত্র। সবারই দীন-হীন বেশ। নেই আশরাফ-আতরাফ বিভেদের অচলায়তন। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, রহমতপ্রাপ্তি ও নিজের গুণাহ মাফের জন্য আল­াহতায়ালার মহান দরবারে অশ্রুসিক্ত ফরিয়াদ জানান সমবেত মুসলমানেরা। একে অপরের সাথে পরিচিত হন, কুশল বিনিময় করেন। বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের এক অনুপম দৃশ্যেরও অবতারণা হয় বিশ্ব মুসলমানের মহাসম্মিলনের দিনে।
 
গতকাল দুপুরে মসজিদে নামিরাহ থেকে খুতবা প্রদান করেন সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আব্দুল আজিজ আল শাইখ (৭৪)। স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার কিছু পরে শুরু হয়ে খুতবা শেষ হয় ১২টা ৪৪মিনিটে।
 
হজের খুতবা শুনে ইমামের পিছনে পরপর জোহর ও আসরের নামাজ জোহরের ওয়াক্তে আদায়ের পর সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন হাজিরা। বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবের সময় ব্যবধান তিন ঘণ্টা। সূর্যাস্তের পর আরাফাতের ময়দান ত্যাগ করে মুজদালিফার উদ্দেশে রওয়ানা হন হাজিরা। মূলত ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানের দিনকেই হজের দিন বলা হয়।
 
৩৫ বছর ধরে হজের খুতবা প্রদানকারী ১৭ বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারানো এই গ্র্যান্ড মুফতি সমগ্র মুসলিম জগেক ‘শিষাঢালা প্রাচীরের’ মতো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়ে বলেন, মুসলমানরা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে ইসলামই হবে পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে বিজয়ী এবং শক্তিশালী আদর্শ। কিন্তু দুঃখজনক হল আমরা মুসলমানরা আজ ঐক্যবদ্ধ নই। কেউ আমরা আমল নিয়ে, কেউ আকীদা নিয়ে বিভক্ত। আমাদের সকলের উচিত আজ শিষাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
 
সৌদি গ্র্যান্ড মুফতি বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। এখানে সন্ত্রাসের স্থান নেই। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে বেশিদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়। শান্তির পথে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ইসলামে শুধু মানবাধিকার নয়, পশুর অধিকার সম্পর্কেও বলা হয়েছে। ইসলাম সাদা-কালো, ধনী-গরিব, রাজা-প্রজার কোনো পার্থক্য করেনি। ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মীয় সভ্যতাই উত্কৃষ্ট। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করার কথাও বলা হয়েছে ইসলামে।
 
সম্প্রতি মক্কায় ক্রেন দুর্ঘটনায় নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন তিনি। হজের ব্যবস্থাপনায় জড়িতদের দোয়া করেন। তিনি বলেন, গণবিধ্বংসী অস্ত্র দিয়ে নিরাপত্তা টিকিয়ে রাখা যায় না। দেশ দখল ও পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত দিয়ে নিরাপত্তা অটুট রাখা সম্ভব নয়। অবরোধ, অনাহার, অধিকার হরণের ফলাফল কখনোই কল্যাণকর নয়। এগুলোর ফলে শত্রুতা আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। তিনি বলেন, আইএস ও হুতো সমপ্রদায় ইসলামের নামে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। ইসলামে এ ধরনের বিদ্বেষ, বিভেদ ও হানাহানির কোন স্থান নেই।
 
সম্মানিত খতিব আরো বলেন, দুর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে, মুসলমানরা আজ ঐক্যবদ্ধ নয়। আর এ কারণেই তারা যেখানে-সেখানে মার খাচ্ছে। অথচ মহান আল্ল­াহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে পাকে এরশাদ করেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধর, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য মুসলমান আজ শতধা বিভক্ত। মহান আল্ল­াহ এবং রাসূল সাল্লাল্ল­াহু আলাইহে ওয়া সাল­াম যেটা চাননি। এটা কাঙ্ক্ষিত বিষয় নয়। মুসলমান একটা দেহের মত। সে পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক অন্য প্রান্তে কোন মুসলমান যদি আক্রান্ত হন, যদি আঘাতপ্রাপ্ত হন, তার সে কষ্টটা সে ততটুকু অনুভব করবে। পৃথিবীর বিপরীত প্রান্ত থেকেও আমাকে ততটুকু ব্যথিত হতে হবে। এটাই ইসলামের শিক্ষা। রাসূল সাল্লাল্ল­াহু আলাইহে ওয়া সাল্ল­াম বলেছেন, মুসলমান পুরো জাতি একটা ঘরের মত তার কোথাও আঘাত লাগলে ভিতর থেকে তা উপলব্ধি করা যায়।
 
নেক আমলের গুরুত্ব সম্পর্কে গ্র্যান্ড মুফতি বলেন, মুসলমান হওয়ার পর ঈমান আনার পর সবচেয়ে গুরুতপূর্ণ হচ্ছে নেক আমল, নামায, রোযা, তসবিহ, তহলিল। এসব কিছুই হচ্ছে নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত। নেক আমলের গুরুত্ব অপরিসীম। যারা ঈমান আনবে তাদের জন্য অপরিহার্য হচ্ছে নেক আমল করা। এ নেক আমলের মাধ্যমে একজন ঈমানদার মুসলমানের পজিশন বৃদ্ধি পায়। নেক আমল শূন্য কোনো মুসলমান ফলশূন্য গাছের মতো। তার দিকে কেউ তাকায় না। কারণ, সেখান থেকে কেউ ফল পায় না। অর্থাত্ তার সে ঈমান ফলপ্রসূ হল না। রাসূলে খোদা ঠিক এভাবেই উদাহরণ দিয়েছেন। সেকারণেই নাজাতের জন্য, আখেরাতের মুক্তির জন্য নেক আমলের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। নেক আমলের প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে শয়তানের ওয়াসওয়াসা। এটা পরিহারের কথাও বলেন সম্মানিত গ্রান্ড মুফতি। মুসলমানের সবচেয়ে বড় জিহাদ হচ্ছে তার নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। কারণ, এই নফসই তাকে কু-প্রবৃত্তির দিকে ধাবিত করে। সব মানুষ এক আদমের সন্তান। মহান রব একজন পুরুষ ও একজন মহিলা থেকে সমগ্র মানবজাতি সৃষ্টি করেছেন। এ হিসেবে তারা সকলেই সমান। এর ওপরের ফজিলত হল তাকওয়ার ফজিলত ঈমানের ফজিলত।
 
মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমাবেশ এবারের হজে ৩০ লাখের বেশি মুসলমান অংশ নিচ্ছেন। আল্ল­াহ রাবু্বল আলামিনের মেহমানরা সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে কেউ গাড়িতে, কেউ পায়ে হেঁটে আরাফাতের ময়দানের দিকে রওনা হন। সৌদি কর্তৃপক্ষ হাজিদের আরাফাত ময়দানে আনার জন্য বিপুলসংখ্যক গাড়ির ব্যবস্থা করেন। ইহরাম পরা মুসলিমদের এই স্রোত যতই আরাফাতের নিকটবর্তী হতে থাকে, ততই তারা ভাবাবেগে উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন। তাদের মানস চোখে ভেসে ওঠে সেই আরাফাত ময়দানের ছবি, যেখানে প্রায় ১৫০০ বছর আগে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্ল­াহু আলাইহি ওয়াসাল্ল­াম বিদায়ী ভাষণ দিয়েছিলেন। এই ময়দানে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রিয় নবীর কাছে সর্বশেষ ওহি নাজিল করেছিলেন, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে (ইসলাম) পরিপূর্ণ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম।’ (সূরা আল মায়িদা, আয়াত-৩) বিদায় হজ থেকে ফেরার তিন মাসের মাথায় ইসলামের কাণ্ডারি রাহমাতুল্লি­ল আলামিন প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাাহু আলাইহে ওয়া সাল্ল­াম ইন্তেকাল করেন।
 
আরাফাতের ময়দান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫০ মিটার উঁচুতে। চারপাশে পাহাড়ঘেরা একটি সমতল ভূমি। হাজিদের কেউ কেউ সেখানে তাঁবু টানিয়ে, কেউবা খোলা আকাশের নিচে মাথায় ছাতা ধরে অবস্থান করেন। অনেকে আগের রাতেই সোজা উঠে যান আরাফাত ময়দান সংলগ্ন ৭০ মিটার উঁচু ‘জাবালে রহমত’ তথা রহমতের পাহাড়ে। রহমতের পাহাড়ে উঠে সেখানেই তাঁরা দিনভর মহান আল­াহর করুণা ও মাগফিরাত কামনা করেন।
 
আরাফাত ময়দানে অবস্থান করা হজের অন্যতম ‘ফরজ’ বা অবশ্য পালনীয়। আরাফাতের পাহাড়ে একটি বড় উঁচু পিলার আছে। একে কেউ কেউ দোয়ার পাহাড়ও বলে থাকেন। উঁচু পিলারের কাছে যাওয়ার জন্য পাহাড়ে সিঁড়ি করা আছে, যাতে এটি বেয়ে খুব সহজে চূড়ায় চলে যাওয়া যায়। জনশ্রুতি আছে যে, হযরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.) দীর্ঘদিন কান্নাকাটির পর এখানেই এসে মিলিত হয়েছিলেন। হাজিদের আরাফাতের ময়দানের পর তাদের গন্তব্য মুজদালিফা। রাতে সেখানে অবস্থান করবেন খোলা মাঠে। শয়তানের প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় পাথর সংগ্রহ করবেন সেখান থেকে।
 
মুজদালিফায় ফজরের নামাজ আদায় করে হাজিরা কেউ ট্রেনে, কেউ গাড়িতে, কেউ হেঁটে মিনায় যাবেন এবং নিজ নিজ তাঁবুতে ফিরবেন। মিনায় বড় শয়তানকে সাতটি পাথর মারার পর পশু কোরবানি দিয়ে মাথার চুল ছেঁটে বা ন্যাড়া করে ফেলবেন। এরপর তারা এহরাম ছেড়ে স্বাভাবিক পোশাকে মিনা থেকে মক্কায় গিয়ে কাবা-শরিফ সাতবার ঘুরে ‘তাওয়াফ’ করবেন। তাওয়াফ শেষে হাজিদের গন্তব্য সাফা-মারওয়া পাহাড়। সেখানে সাতবার দৌড়ানোর পর তাদের আবার মিনায় তাঁবুতে ফিরে আসতে হবে। এরপর ১১ এবং ১২ জিলহজ সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার (জোহরের ওয়াক্তের পর থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত) সাথে সাথে ছোট, মেঝো এবং বড় জামারাকে (তিন শয়তান) পাথর মারতে হয়। তিন শয়তানকে পাথর মারা শেষ হলে সূর্যাস্তের পর মিনা ত্যাগ করে হাজিরা পবিত্র মক্কা নগরীতে ফিরে আসবেন।
 
পবিত্র কাবা শরিফের গায়ে নতুন গিলাফ
 
পবিত্র কাবা শরিফকে আবৃত করে রাখা কাপড়টিকে আরবরা বলে কিসওয়া। আর আমরা বলি গিলাফ। গতকাল কাবা শরিফের গায়ে পরানো হয় নতুন গিলাফ। প্রতিবছর ৯ জিলহজ অর্থাত্ হজের দিন হাজিরা আরাফাতের ময়দানে থাকেন। হাজিরা আরাফাত থেকে ফিরে এসে কাবা শরিফের গায়ে নতুন গিলাফ দেখতে পান। নতুন গিলাফ পরানোর সময় পুরোনো গিলাফটি সরিয়ে ফেলা হয়। পুরোনো গিলাফ কেটে মুসলিম দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের উপহার দেয়া হয়।
 
কাবা  শরিফের দরজার ও বাইরের গিলাফ দুটিই মজবুত রেশমি কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়। গিলাফের মোট পাঁচটি টুকরা বানানো হয়। চারটি টুকরা চারদিকে এবং পঞ্চম টুকরাটি দরজায় লাগানো হয়। টুকরাগুলো পরস্পর সেলাইযুক্ত। নতুন গিলাফটি তৈরি করতে ১২০ কেজি স্বর্ণ, ৭০০ কেজি রেশম সুতা ও ২৫ কেজি রূপা লেগেছে। নতুন গিলাফটির দৈর্ঘ্য ১৪ মিটার এবং প্রস্থ ৪৪ মিটার।