আজ বুধবার, ২৩ অগাস্ট ২০১৭, ০৭:৫৪ অপরাহ্ন logo

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ০৮:১৬ অপরাহ্ন

ভুলেও যেন ভুলে না যাই মা-বাবাকে

জনতার নিউজ২৪ ডটকম :

আদর্শ মা-বাবা হওয়ার জন্য পৃথিবীর কোন বিখ্যাত-অখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনদের প্রয়োজন হয়না কিংবা  কোনদিন হয়নি এবং হবেও না কোনদিন । সন্তানের কল্যান সাধনে মা-বাবার সাথে অন্য কারও তুলনাও চলে না । পৃথিবীর প্রতিটি সন্তানের জন্য উত্তম আদর্শ তাদের মা-বাবা । মা-বাবাই আবার প্রতিটি সন্তানের প্রিয় মূখ । সন্তানের জন্য মা-বাবাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিক্ষক । মা-বাবার শিক্ষা-সচেতনতায় সন্তান যেমন সু-সন্তানে পরিণত হয় আবার তাদের ব্যর্থতায় সন্তান বিপথগামীও হয় । প্রত্যেক মা-বাবার প্রকৃতি আলাদা হলেও সন্তানের কাছে তার মা-বাবাই শ্রেষ্ঠ । এই শ্রেষ্ঠত্বের ওপর অন্য কোন শ্রেষ্ঠত্বের প্রভাব-প্রধাণ্য চলে না কিংবা চলবেও না কোনদিন ।

আজ আমার মা-বাবার কথা বলব । আমি জানি, আমার মা-বাবা আমার জন্য যেমন মঙ্গলময় এবং কল্যানের চিন্তায় বিভোর থাকেন তেমনি প্রত্যেকটি সন্তানের পিতা-মাতা তাদের আপন সন্তানদের মঙ্গল-কল্যানের চিন্তায় বিভোর । পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র বাবা-মায়ের একই চিত্র-রূপ । কাজেই আমি বিশ্বাস করি, আমার বাবা-মায়ের যে গল্প বলব এটা সকল সন্তানের পিতা-মাতার গল্পই হবে । তবে কিছুটা ব্যতিক্রম যে থাকবে না সেটা ভাবারও সুযোগ নাই । তবে নিশ্চিত করে বলতে পারি, পিতা-মাতার গুন-আদর্শগুলো প্রায় কাছাকাছি এবং সার্বজনীন । পিতা-মাতার গুন ও আমাদের জীবনে তাদের অবদান বর্ণনা করে শোনানোর সাহস করা বেয়াদবী কেননা এ অবদানের কোন সীমা-পরিসীমা করা চলে না । সেই ছোট্ট বেলায় ভাষাহীন আমার শুকনো মুখে মা যদি সময়মত এক ফোঁটা দুধ তুলে না দিতেন তবে আজ কোথায় থাকত আমার/আমাদের অবস্থান ? বাবা যদি তার রক্তকে ঘাম না করে আমার/আমাদের জন্য রোজগার না করতেন তবে কি পরিণতি হত আমাদের ? এগুলো ভাবছি তো ?

আমার মা ! বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে তার সর্বত্র । সপ্তাহের দু’দিন সুস্থ থাকলে বাকী চারদিন অসুস্থ থাকেন । শত-সহস্র রোগ-ব্যাধি তাকে গ্রাস করে রেখেছে । আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, আমার মা-ই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মা । পাড়া-পড়শী, আত্মীয়-স্বজন হয়ত তার অজস্র দোষ খুঁজে পাবেন কিন্তু আমাকে লালন-পালনে কিংবা সন্তানের স্বার্থ সংরক্ষণে তার বিন্দুমাত্র ত্রুটি কোন মানুষ তো দূরের কথা কোন যন্ত্রও খুঁজে বের করতে পারবে না । তিনিই পৃথিবীর বুকে একমাত্র অবশিষ্ট ব্যক্তি যিনি সর্বদা স্বার্থহীনভাবে আমার মঙ্গল কামনায় ব্যস্ত । তার গর্ভের দিনগুলোর কথা বাদ দিলাম কিন্তু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে আজ এই ২৩ শরৎ অবধি যতভাবে তাকে জ্বালাতন করেছি, এই জ্বালাতন যদি মা ছাড়া অন্য কোন নারীকে করতাম তবে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি সেই অপরাধেই আমার ফাঁসি হয়ে যেত । অগণন অপরাধ করেও যার কাছে বিচারের আগেই আমি নির্দোষ ছিলাম সে আমার জন্মদাত্রী মা । আমার মায়ের উচ্চ-শিক্ষার কোন সনদ নাই, তাই বলে মাতৃত্বের দায়িত্বে তিনি মোটেও ব্যর্থ নয় বরং শতভাগ সফলতার দাবিদার । আমার প্রতি মায়ের ত্যাগ স্বীকারের প্রতিটি দিনের দায় শোধ করতে আমাকে সহস্রবার জন্মানোর সুযোগ দিয়ে এবং প্রতিবার সহস্র বছর আয়ু দিলেও আমি মায়ের এক দিনের ঋণ শোধ করতে পারব না । শুধু আমি কেন, এ ঋণ শোধ করার দায়িত্ব পৃথিবীর কোন সন্তানের নাই ।

বাব আমার বাবা ! বাস্তব জীবনে তিনি একজন শিক্ষক ছিলেন কিন্তু এর চেয়েও তার বড় পরিচয় তিনি আমার বাবা কিংবা আমি তার সন্তান । সন্তানের প্রতি বাবা কিভাবে ছায়া হতে পারেন তা আমার বাবাকে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না । তাই আমার বাবাকে আমি শ্রেষ্ঠ বাবা হিসেবে অনায়াসে দাবী করতে পারি । এটা শুধু দাবী নয় বরং ধ্রুব বাস্তবতা; এ দাবীতে আমার পক্ষ থেকে ছিটে-ফোঁটা আবেগ নাই । বাবার কাছেই শিখেছি আদর্শ কাকে বলে । সেই না বোঝার বয়সে অপরের বাগান থেকে একটি তাল না বলে আনার অপরাধে বাবার হাতে প্রথম মার খেয়েছিলাম । সেদিনের সে ভয় আমাকে আর কোনদিন অপরের কোন বস্তু না বলে ধরতে সাহস দেয়নি । পূর্ণ যুবক বলতে যা বোঝায় সেই বয়সটা এখন অতিবাহিত করছি কিন্তু তাই বলে বাবার কাছে আমি এখনও যুবক নই বরং সেই ছোট্টটি-ই এখনো রয়ে গেছি । গ্রামের বাড়ীতে কোনদিন মাগরিবের আযানের পরে বাহিরে থাকতে পেরেছি এমন বিশেষ স্মৃতি খুব বেশি নাই । এ বছরের কোরবানীতে সন্ধ্যারপর ঘন্টা দু’য়েক বাইরে ছিলাম বলে বাবা গিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমার আগমনে প্রহর গুনেছে । বয়সের প্রতাপে এতে আমার খারাপ লাগে নি যে তা নয় তবে, পিতৃত্বের দায়িত্ব দেখে আমি বিমোহিত হয়েছি ।

সত্যিকারার্থের বাস্তবতা, সন্তানের প্রতি বাব-মায়ের অবদান বর্ণনা করে শেষ করা যায়না । এমনকি কয়েক হাজার কোটি ভাগের একভাগও বলে শেষ করা যাবে না কোন প্রচেষ্টায় । সেটা আমিও পারিনি কিংবা পারবও না কোনদিন । তাদের ঋণও শোধ করা যাবে না । তবে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বাবা-মাকে যেন কোন অবস্থাতেই কষ্ট না দেই; এই ধৈর্যটুকু সব সন্তানের জন্য অর্জন করা অপরিহার্য । বাব-মা অশিক্ষিত কিংবা গ্রাম্য বলে যেন তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র অবহেলা না আসে সে দিকে প্রত্যেক সন্তানের খেয়াল থাকা আবশ্যক । যুগের সাথে আমার/আমাদের মা-বাবা হয়ত বেমানান কিন্তু এই বেমাননা মা-বাবাই আজকের আমাকে/আপনাকে পৃথিবীতে আগমনের সুযোগ এবং পরম যত্নে লালিত-পালিত করে বড় করেছে । কাজেই তাদেরকে যেন ভুলেও কখনো ভুলে না যাই কিংবা অবহেলা না করি । তাদেরকে অবহেলা করার পূর্বে প্রত্যেক সন্তানের মৃত্যু কামনা করা উচিত । ধর্ম এবং বিবেকের শিক্ষায় বলিয়ান হয়ে যেন মা-বাবার সন্তুষ্টির কারণ হতে পারি । আমরা আমাদের মা-বাবার প্রতি যেন অধিক যত্নশীল হই এবং তাদের জন্য প্রভাত-সাঁঝের বেলায় বেশি বেশি দোয়া করি । আমাদের মা-বাবা যেমন করে আমাদেরকে ছায়া দিয়ে রেখেছেন তেমিন তাদের বৃদ্ধ বেলায় আমরাও তাদেরকে যেন পূর্ণ ছায়া দিয়ে রাখতে পারি । কোন স্বার্থ যেন আমাকে/আমাদেরকে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব থেকে ছিটকে দিতে না পারে । পিতামাতার জন্য যেন আমরা প্রত্যেকেই সু-সন্তান হতে চেষ্টা করি; এটা করা উচিত ।  

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।
facebook.com/rajucolumnist/