আজ সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০১:২৬ পূর্বাহ্ন logo

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০১৫, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ন

ন’বাধ্য ইলিশ !

জনতার নিউজ২৪ ডটকম :

বহু বস্তুর খাদক হিসেবে জগতের বহু সংখ্যক মানুষের খ্যাতি রয়েছে কিন্তু ইলিশ খাদক হিসেবেও যে মানুষের বিশেষত্ব থাকতে পারে তা আমার প্রাণের ঝালবিবির সান্নিধ্যের দর্শন না পেলে অজ্ঞাতই থেকে যেত । ঈশ্বরকে ধন্যবাদ এ কারণে যে, জীবন এমন একজন খাদকের সান্নিধ্যের সুযোগ তিনি এই অধমকে দিয়েছেন । এটাকে কি কেবলই সান্নিধ্য বলে ! কলিজা বের করে তপ্ত ঘিয়ের কড়াইয়ে দো’ভাজি দিলে যতটা আরাম পাওয়া যায় তেমন শান্তির সহচর্যই পেয়েছি ! পাঁজি বের করে হিসাব করে দেখলাম ঝালবিবির সাথে একই চুলায় একই হাড়িতে রন্ধন খাওয়ার বয়স তিন যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে । তবুও সৌভাগ্য যে আজও আমি বেঁচে থেকে ঝালবিবির গুনোকীর্ত্তন বর্ণনা করতে পারছি । আমার কাঁধে ঝালবিবির মত এমন জগদ্দল পাথর চাপিয়ে তার বাপ হাসতে হাসতে বলেছিল বাবা ! কিছু মনো করো না ! আমার মেয়েটির মত এমন ভালো মেয়ে তুমি জগতে দুইখানা পাবে না । কোন কিছু নিয়ে তোমার সাথে কোনদিন উচ্চাবাচ্চ্য করবে না । কোন কিছু কিনে না দিলেও তোমার সাথে গোস্বা করবে না, তবে ! তখন শ্বশুড় মহাশয়ের এমন মধুর কথা শোনার সময় কখন ছিল; এদিকে যে বাসরঘরের তাজা ফুলগুলো দর্শনের খায়েশে আমি ব্যাকুল ছিলাম । শ্বশুড় মহাশয় সেদিন বলেছিল, তার মেয়েটা একটু ইলিশের ভক্ত । আমার কাছে শ্বশুড় মহাশয়ের এমন আব্দার খুব হাস্যকর মনে হয়েছিল । আমার বাপ-চাচা ইলিশ শিকারের জেলে হতে না পারে কিন্তু প্রিয় ঝালবিবিকে যে ইলিশ কিনে খাওয়াতে পারব না এমন অথর্ব স্বামী তো আমি নই ! কিন্তু দিনে দিনে ঝালবিবির ইলিশ আসক্তি আমাকে শুধু ভাবিয়ে তোলেনি বরং একজন সুনামধন্য সৎ কর্মচারীকে পাড়ার শ্রেষ্ঠ ঘুষখোর হিসেবে পরিচিত করেছে । এছাড়া আর কি উপায় ছিল ? বিবাহের তিন বছরের মাথায় চতুর্থ সন্তানটি জন্মানোর পর ঝালবিবির যেমন ইলিশের প্রতি তৃপ্ততা বেড়ে গেল তেমনি হঠাৎ করে ইলিশের দামও খপ করে আমার পকেটের সাধ্যের বাহিরে চলে গেল । ঝালবিবির স্বাদ পূরণ করতে গিয়ে আমার বেতনের টাকা মাসের ১৭ তারিখেই শেষ হয়ে যেত কিন্তু তাতে তার জিহ্বায় ইলিশের স্বাদ কোনভাবেই বিস্বাদ ঠেকল না । কি আর করা ? লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে অফিসের সৎ কর্মচারীটি অফিসের শ্রেষ্ঠ ঘুষখোর হিসেবে নাম করল ! আমার সমালোচকরা নাকি বলছে,  দেশের শ্রেষ্ঠ ঘুষখোরের প্রতিযোগিতায় আমার নামও নাকি রয়েছে !

ঝালবিবির ইলিশের প্রতি যে আসক্তি তার চেয়ে কোন অংশেই তার কম দরদ আমার প্রতি নয় । ইলিশ খেলে অনেকের চুলকানি রোগ বৃদ্ধিপায় বলে শুনেছি কিন্তু আমার কখনো এমন উপসর্গ দেখা যায়নি তবুও ঝালবিবির কাছে বাহানা করে বলতাম আমার ইলিশ খেলেই খুব চুলকানি হয় ! এতে অবশ্য হিতে-বিপরীত ঘটেছিল । ঝালবিবি সারারাত জেগে তার কুঠারের মত নখাগ্র দিয়ে আমার সারা শরীর চুলকিয়ে রক্ত বের করে দেয়ার অবস্থা করত । কাজেই বাধ্য হয়ে চুলকানীর বাহানা ত্যাগ করেছি । মাঝে মাঝে ভাবতাম ইলিশের মৌসুমে ঝালবিবিকে আমার পরমাত্মীয়ের বাড়িতে রেখে আসবো, যাতে অন্তত আমি ইলিশের খপ্পর থেকে বেঁচে যাই কিন্তু কিসে কি ! আমাকে ছেড়ে নাকি তার দু’দন্ড কোথাও থাকতে ইচ্ছা হয়না । আকুল ভেবেও কূল পেলাম না, এটা আমার প্রতি ঝালবিবির ভালোবাসা না বাপের টাকা বাঁচানোর বাহানা । অবশ্য ঝালবিবির প্রতি আমার ইতিবাচক ধারণাই বহাল থাকল কেননা দীর্ঘ তিন যুগ জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে আমাকে অঙ্গার করে অবশেষে তার প্রেম পরিষ্ফুটিত হতে আরম্ভ করেছে । একপা কবরে রাখা এ বুড়োটার জন্য এটা কি কম আনন্দের খবর ! কিন্তু মনের স্বাদের কার্যকারীতা থাকিলেও অন্যসব দিক যে মরে মরুভূমি হয়ে গেছে সেকথা ঝালবিবির চেয়ে আর কে বেশি জানে ! তবুও ইলিশ খাওয়ার বাহানায় ঝালবিবির মৌখিক ভালোবাসা আমার প্রতি অবশিষ্ট রয়েছে, এটাই তো আমার সাত পুরুষের ভাগ্য ! অবশ্য স্বীকার্য সত্য যে, ঝালবিবিকে তো ইলিশ খাওয়ার জন্য বাহানা করতে হয়না বরং এটা এখন তার অঘোষিত নির্দেশ হিসেব আমার জন্য অবশ্য পালনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ! আমি তাকে ইলিশ কিনে না দিলে সে আমার দেহকে আগুনে পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করে তা বিক্রি করেও যে ইলিশ খরিদ করে খেতে কুন্ঠাবোধ করবে না তা আমার চেয়ে আর কে বেশি জানে !


ইলিশের প্রতি প্রবল আসক্তি সত্ত্বেও সরকার যখন ইলিশ শিকারের প্রতি নিষেধাজ্ঞা দেয় তখন ঝালবিবি কোনভাবেই ইলিশ খাওয়ার কথা উচ্চারণ করেনা । দীর্ঘদিন গবেষণা করেও এ বিশেষ দিনগুলোতে ইলিশ ও আমার প্রতি ঝালবিবির এ মমতার কথা আবিষ্কার করতে পারিনি । ক্ষমতা যার প্রধান অস্ত্র মমতা তার কেন দরকার ? তবে মনে হয়েছে, আরও দীর্ঘদিন নির্ভাবনায় ইলিশ খাওয়ার লোভেই ঝালবিবির এ ত্যাগ ! অতীতের বছরগুলোতে ইলিশ শিকারের প্রতি অবরোধ ঘোষণা হওয়ার পূর্বেই ঝালবিবি আমাকে কড়া নির্দেশ দিয়ে কিছু ইলিশ ক্রয় করতে বাধ্য করে এবং আমাকেসহ সংসারের সকলকে বঞ্চিত করে সে ইলিশের কাঁটা-খসি থেকে শুরু করে নাড়ী-ভূড়ি পর্যন্ত একাই ভক্ষণ করে । তবে চলতি বছরের অবরোধের পূর্বে ঝালবিবি আমাকে একবারও ইলিশ কিনে রাখতে আদেশ করেনি । আমি ভেবেই পাচ্ছিলাম না, এর কারণ কি ! ঝালবিবিকেও এর রহস্য জিজ্ঞাসা করতে পারছিলাম না কেননা তাতে হিতে-বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ! তারপরেও কৌতুহল দমাতে না পেরে কারণ জিজ্ঞাসা করতেই ঝালবিবি তার পান খেয়ে লাল দাঁগযুক্ত দাঁতগুলো বের করে বলল-এ বছরের অবরোধের তারিখ সে গুলিয়ে ফেলেছিল । সে ভেবেছিল আগামী মাসে অবরোধ ! আমি বাঁচলাম ! ইলিশ বিষয়েও তবে তার ভূল হয় ! যেদিন অবরোধ শেষ হল সেদিন ঝালবিবির খুশি দেখে কে ! আমাকে সারা রাত ঘুমাতে দেয়নি ! আহারে ! ঝালবিবি যদি প্রত্যেক রাতেই এভাবে আমাকে জাগিয়ে রাখত তবে বোধহয় আমি আরও হাজার বছর বেঁচে থাকার ইচ্ছা করতাম । তবুও সে ইচ্ছা আর করলাম না কেননা আগামী রাতে ঝালবিবির আচরণ ও আমার পরিণতি তো আর অজানা নয় । যাইহোক, সকাল সকাল ব্যাগ ধরিয়ে ঝালবিবি আমাকে ইলিশ মাছ কিনতে পাঠালো । বাজারে গিয়ে দেখি ইলিশ যা উঠেছে তার চেয়ে ক্রেতার সংখ্যা বেশি । মনে ভাবলাম, আমার ঝালবিবির মত ঝাঁজবিবি বোধহয় এদেরে কপালেও জুটেছে । অনেক ধরাধরি করে দু’হালি ইলিশ খরিদ করলাম । চেয়েছিলাম এক হালি কিনব কিন্তু ইলিশের সংখ্যা বেশি দেখলে ঝালবিবির মুখ কেমন হাসিমাখা হয়ে উঠবে সে দৃশ্য মনের আয়নায় ঢেউ খেলাতে এবং গতরাতে আমাকে জাগিয়ে রাখার পুরস্কার হিসেবে এক হালির যায়গায় দু’হালি ইলিশ ব্যাগে ঢুকিয়ে বাসায় ফিরে এলাম । আমার আগমনে ঝালবিবির খুশি দেখে মনে হল, আমি বুঝি বৃহস্পতি জয় করে ফিরলাম ! ঝালবিবি দা-বটিতে আগেই শান দিয়ে রেখেছিল । আমার দর্শন পেয়েই চিলের মত ছোঁ মেরে মাছের ব্যাগটি নিয়ে ঝালবিবি সোজা রান্না ঘরে । ধন্যবাদ পাওয়ার আশায় গুঁড়েবালি দেখে আমি  ‘দ’ হয়ে বসে পড়লাম । কিছুক্ষন পর রান্নাঘর থেকে ঝালবিবির চিৎকার ভেসে এল । আবিষ্কার করলাম, আমাকে ডাকছে । রান্নাঘরে প্রবেশ করার পরেই আমাকে বৃহৎ আকারের ১৬ টুকুরো ইলিশের ডিম দেখাল ! ঝালবিবি খুব আফসোস করে বলল, ইলিশে ডিমই যদি থাকবে তবে এতগুলো দিন আমাকে ইলিশ ভক্ষণ থেকে কেন বঞ্চিত রাখা হল ? মনে পড়ে গেল পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের কবিতার লাইন, ‘তোমার কথার উত্তর দিতে কথা থেমে গেল মুখে, সারা ‍দুনিয়ায় যত ভাষা আছে কেঁদে ফিলে গেল দুঃখে’ ।  মনে ভাবিলাম, যে সব মৎস কর্মকর্তা পালিত এ সময়টাতে ইলিশ পোণা ছাড়ে বলে রাষ্ট্রকে পরামর্শ দিয়েছে ইলিশ শিকারে অবরোধ দেয়ার জন্য তারা হয়ত ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রেই পরীক্ষা দিয়েই মৎস বিশেষজ্ঞ হয়েছে অথবা ইলিশগুলোও প্রকৃতি বিরুদ্ধতায় নেমেছে । যদি দ্বিতীয় কারণ সত্য হয় তবে নির্ধারিত সময়ে ডিম না ছাড়ার অপরাধে ইলিশের শাস্তি হওয়া আবশ্যক । কেননা, এ ইলিশগুলো রাষ্ট্রের বড় বড় কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করে রাষ্ট্রদ্রোহীতা তুল্য অপরাধ করেছে ! আমার ভাবনায় ছেদ দিয়া ঝালবিবি উচ্চকন্ঠে বলিল, ইলিশগুলোও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ন’বাধ্য হয়ে গিয়েছে । আমি ঝালবিবির বাংলা বিষয়ক জ্ঞানের গভীরতা পূর্ব থেকেই অবগত তাই ‘ন’বাধ্য’ শুনে হাসতে পারলাম না, কেননা এ শব্দ শুনে হাসলে ঝালবিবির সাথে বসে ইলিশ খাওয়ার স্বপ্নের স্বাদের বিস্বাদ ঘটে যেত ! সেই থেকে ভাবছি আর ভাবছি, ইলিশগুলো কার ষড়যন্ত্রের সাথে ঐক্যমত হয়ে এমন চক্রান্ত করল ! এ চক্রান্তের রহস্য উদঘাটনের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা আবশ্যক বোধহয় !!

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।