আজ শনিবার, ২২ Jul ২০১৭, ০২:৫৪ পূর্বাহ্ন logo

মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৫, ১০:৫০ পূর্বাহ্ন

ডিমলায় প্রশাসনের সিন্ধান্তকে উপেক্ষা করেই পাথর-বালু উত্তোলন

বাদশা সেকেন্দার ভুট্ট

জনতার নিউজ২৪ ডটকম

নীলফামারীঃ নীলফামারী জেলাধীন ডিমলা উপজেলায় জেলা প্রশাসনের সিন্ধান্তকে উপক্ষো করে এবার দিন রাতেই পাথর-বালু উত্তোলন চলছে। ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজের উজানে মুল তিস্তা নদীর বুক চিরে প্রায় শতাধিক অসাধু পাথর ব্যবসায়ীরা যে যার মতো করে তিস্তা নদী দখল করে ভারী শক্তিশালী ড্রেজার মেশিন লাগিয়ে পাথর-বালু উত্তোলনের মহোৎসব চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।

গত ১৬ নভেম্বর সকালে টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের দক্ষিন খড়িবাড়ী গ্রামের তিস্তার চর ও ভাসানীর চর, খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের তিস্তা কিসামতের চর এবং পূর্বছাতনাই ইউনিয়নের তিস্তার নদীর ঝাড়শিংহের চর এলাকায় দেখা যায় ইতিপূবেই যেসব মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করা হতো সেগুলি না সরিয়ে প্রশাসনের সিন্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রায় অর্ধ-শতাধিক শক্তিশালী ড্রেজার মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করছে।

এবার দিনরাত ২৪ ঘন্টাই। কিসামতের চরে নুরুল হক,জেনারুল ইসলাম,আইয়ুব আলী, খাদেমুল ও জুলহাস প্রমুখ। টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের উত্তর খড়িবাড়ী ভাষানীর চরে আব্দুর রশিদ,আবদুল মাজেদ,আব্দুল আজিজ ও রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।

পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড়শিংহের চরে আমিনুর রহমান,দুলাল হোসেনসহ প্রায় শতাধিক পাথর উত্তোলনকারী ব্যবসায়ীরা বিরামহীন ভাবে এসব পাথর-বালু উত্তোলন করছে আইনের তোয়াক্কা না করেই।

প্রসঙ্গ গত,বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেএী শেখ হাসিনা এসব পাথর বালু উত্তোলন বন্ধে নির্দেশ প্রদান করেন। তবে যান্ত্রিক মেশিন ছাড়া দেশীয় পদ্ধতি খনিজ সম্পদ পাথর-বালু উত্তোলন করা যাবে মর্মে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেন। সরকারের এই সিন্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে ব্যবসায়ীরা পাথর-বালু উত্তোলন করতে থাকে দীর্ঘদিন ধরে। এ সংক্রান্ত খবর বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশের পরেই প্রশাসন জরুরী সভা ডেকে এসব ভারী যান্ত্রিক মেশিন বন্ধের সিন্ধান্ত নিলেও কোন মতেই মানছে না পাথর ব্যবসায়ীরা।

খগাখড়িবাড়ীর পাগলপাড়া গ্রামের বিশিষ্টি সমাজ সেবক কোরবান আলী বলেন, প্রশাসন কাগজে কলমে এসব মেশিন বন্ধের সিন্দান্ত নিলেও তাদেরই চোখের সামনে চলছে এসব মেশিন। এসব দেখ মনে হয় শর্ষের ভিতরেই ভূত! রাতের আঁধারে এসব পাথর উত্তোলনের ফলে তিস্তানদীর মধ্যখানে বিশালাকৃতি পিড়ামিডাকৃতি বালুর পাহাড়ে পরিণত হয়েছে।

পাথর উত্তোলনকারী ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পাথর বন্ধের সিন্ধান্ত স্থানীয় প্রশাসন নিতে পারেন না । আমরা খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অর্ডারে পালর-বালু উত্তোলন করছি। একই ভঙ্গিতে পূর্বছাতনাই ইউনিয়নের পাথর উত্তোলনকারী আমিনুর রহমান বলেন, মেশিন বন্ধের জন্য জেলা প্রশাসকসহ অনেকেই মন্ত্রণালয়ে ২০/২৫টি অভিযোগ পাঠিয়েছে কিন্তু তারপরও আমারা পাথর উত্তোলনের অনুমতি পেয়েছি।

তারা জানায় আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরে টাকা জমা দিয়ে এসেছি। সম্প্রতি অধিদপ্তর থেকে কর্মকর্তাগণ মাঠ পর্যায়ে এসে দেখে গেছেন। খুব শিঘ্রই পরিবেশগত ছাড়পত্র পাব। কিন্তু পরিবেশের ছাড় না পেয়েই কেন যান্ত্রিক মেশিন দিয়ে পাথর-বালু উত্তোলন করছেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টাকা হলে সব হয়। আবেদন করেছি আর কি লাগবে ? বাকী কাজ টাকায় হবে। উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় পাথর-বালু উত্তোলনে বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব),নীলফামারী এর অফিস কক্ষে গত ২১ অক্টোবর  জরুরী সভায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো: মজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে ডিমলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো: তবিবুল ইসলাম,ডালিয়া পাউবো’র পত্তর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: মোস্তাফিজুর রহমান, ডিমলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: রেজাউল করিম, নীলফামারী-১ আসনের সাংসদ মনোনিত প্রতিনিধি মো: শহিদুল ইসলাম,পাথর-বালু উত্তোলনকারী ব্যাবসায়ী ও অভিযোগকারীসহ প্রায় ৭৫ জন সদস্য উপস্থিত থেকে বিভিন্ন সিন্ধান্ত গ্রহন করেন।

সভার কার্যবিবরণী সূত্রে,তিস্তা নদীসহ আশে পার্শ্বে ৭০/৮০টি বোরিং মেশিন দ্বারা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ৬০/৭০ ফিট গভীর খনন করে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে তিস্তা ব্যারাজের এর উপড় প্রভাব পরছে ও তিস্তা নদীর গতি প্রকৃতি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হচ্ছে, যা পরিবেশে মারাক্তক ক্ষতি হচ্ছে। ইজারাগ্রহীতারা অযান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন না করে ফোর সিলিন্ডার,সিক্স সিলিন্ডার/ড্রিল-ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে পাথর উত্তোলন করার কারনে বড় বড় গর্ত হচ্ছে, ফলে কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে এবং পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। পাথর বহনকারী ট্রলি/ট্রাক্টর বেরী বাধেঁর উপড় দিয়ে পরিবহন করার কারনে তিস্তার গাঁইড/বেরী বাঁধ নষ্ট হচ্ছে। এতে করে সাধারণ মানুষ ও স্কুলগামী বাচ্চারা চলাচল করতে পারছে না, এছাড়াও পাথর উত্তোলন ও ভাঙ্গানোর শব্দে লোকালয়ে বসবাস করা খুবই কষ্টকর হচ্ছে। প্রচন্ড শব্দে বাচ্চা ও বয়স্কদের কানের সমস্যা দেখা দিয়াছে।

ডিমলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধ মো: তবিবুল ইসলাম বলেন,সরকারের শর্ত অনুযায়ী কেহই পাথর উত্তোলন করছেন না। আর যারা কার্যাদেশ পেয়ে পাথর উত্তোলন করছেন তাদের কোন পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। এমন কি বোরিং মেশিন দিয়ে  পাথর উত্তোলন ও ক্রাসিং মেশিন দিয়ে পাথর ভাঙ্গানোর ফলে জনগনের ঘর-বাড়ী নষ্ট হচ্ছে,প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে,ভিক্ষুকের সংখ্যা বাড়ছে,নদীর গতিপথ ভিন্নখাতে প্রবাহিত হচ্ছে,ভূমিকম্পের আশংকা বাড়ছে। অনবরত পাথর উত্তোলনের কারনে সংশ্লিষ্ট রাস্তাগুলি চলাচলে অনুপোযোগী হচ্ছে।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: রেজাউল করিম সভায় জানান, বৈধভাবে কার্যাদেশ প্রাপ্ত ব্যক্তিগনের পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকলে পাথর উত্তোলন করা অবৈধ হবে এবং শর্ত ভংগ করে তারা পাথর উত্তোলন করছে। সভায় আলোচনা ও পর্যালোচনার পর মজিবুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), নুড়ি পাথর উত্তোলনের কার্যাদেশ প্রাপ্ত ৩৯ জনের মধ্যে উপস্থিত কয়েক জনকে অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সকলেই বলেন, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন করা সম্ভম হয় না,ফলে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে বলে স্বীকার করেন। এবং তারা জানান,তাদের পরিবেশগত ছাড় পত্র নেই।

সভায় সিন্ধান্ত গৃহীত হয় যে, পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহন ব্যতিত পাথর উত্তোলন কার্যক্রম বন্ধ থাকবে,লাইসেন্সের শর্ত ভঁঙ্গ করা যাবে না,ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন করতে হবে,অবৈধ পাথর উত্তোলনকারীদের তথ্য প্রশাসনকে অবহিত করতে হবে,সীমানা চিহ্নিতকরণ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন জায়গায় পাথর উত্তোলন করা যাবে না,যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন করা যাবে না, নদী,ব্রীজ,বাঁধ,রাস্তা-ঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন জায়গায় পাথর উত্তোলন করা যাবে না। সর্বোপরি লাইসেন্সের শর্ত এবং সভার সিন্ধান্ত ভঙ্গ করে পাথর উত্তোলন করা হলে লাইসেন্স বাতিলের পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।