আজ শনিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৭, ০৬:৪৭ পূর্বাহ্ন logo

শুক্রবার, ১৯ মে ২০১৭, ১২:২৬ অপরাহ্ন

কান শহরের মজার কথা

নিউজডেস্ক

 

জনতার নিউজ২৪ ডটকম :

সিঁধেল চোরদের আড্ডাখানা হিসেবে শহরটির খ্যাতি ছিল। প্রসাধন ব্যবসায়ীদেরও স্বর্গ বলা চলে। ফরাসি দেশের হলেও শহরের গড়ে ওঠান পেছনে ছিলেন একজন ব্রিটিশ। ভূমধ্যসাগর তীরের শহর কান-এ গতকাল বুধবার থেকে শুরু হয়েছে ইউরোপের সেরা চলচ্চিত্র আসর। চলচ্চিত্র দুনিয়ার তাবৎ মানুষজনদের মিলন ঘটে শহরটিতে। অস্কারের পরেই কান চলচ্চিত্র উৎসব নিয়ে হইচই হয় গণমাধ্যমে। শহরটি ঘিরে কিছু মজার তথ্য থাকল এ লেখায়।

 সিনেমা নয়

রূপালি পর্দায় সবকিছুই ঠিকঠাকভাবে ঘটে। প্রথমে প্রেম, তারপর ক্লাইমেক্স, সবশেষ মিলন। কিন্তু কান উৎসবের সূচনাটা কিন্তু একটু ভিন্ন ছিল। উৎসবটির সূচনা করেছিলেন যিনি, উৎসব শুরু হওয়ার আগেই মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। তখন ১৯৩৯ সাল। ফরাসি শিক্ষামন্ত্রী জঁ জায় বিশ্বব্যাপী একটি চলচ্চিত্র উৎসবের ধারণা তুলে ধরেন। এটা অবশ্য ইতালিতে হওয়া ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের সঙ্গে ফরাসিদের সিনেমা নিয়ে একটি পাল্লা দেওয়া বললেও ভুল হবে না। কারণ তখন ভেনিস উৎসবটি হতো তৎকালীন স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনি ও তাঁর বন্ধু অ্যাডলফ হিটলারের খেয়ালখুশি অনুযায়ী।

আটলান্টিকের তীরে ফরাসি শহর বিয়ারিতজ। পরিকল্পনা হলো, এখানেই শুরু হবে উৎসবটি। কিন্তু অর্থনৈতিক দৈন্যে হয়ে ওঠেনি। তখনই নাম আসে কান শহরের। তবুও হলো না শুরু। এরই মাঝে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘনিয়ে এল। মুসোলিনি বাহিনী আক্রমণ করে শহরটিকে। অবশেষে যুদ্ধ বন্ধ হলে ১৯৪৬ সালে উৎসবটির পর্দা ওঠে। আর খুব তাড়াতাড়ি হয়ে উঠে বিশ্বের অন্যতম উৎসবের একটি। কিন্তু ১৯৪৪ সালেই মৃত্যু ঘটেছে জঁ জায়ের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্সের একটি অংশ জার্মানি দখল করে নিয়েছিল। ইহুদি হওয়ার কারণে ফরাসি সমন্বয়ক সরকার মেরে ফেলে তাঁকে।

 বিলাসী তটভূমি

পুরাণ মতে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ফরাসি এই সমুদ্র তীরটি (ফ্রেঞ্চ রিভেরা) ইউরোপের রাজারা তৈরি করেছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, শীতকালীন ছুটি কাটানো। তাঁদের বানানো রাজকীয় প্রাসাদগুলো এখন দখল করেছে রাশিয়ার ব্যবসায়ী ও গালফের ধনী উপজাতীয়রা। তাঁদের বিলাসী চাহিদা মেটাতে গড়ে উঠেছে বিলাসী প্রসাধনী পণ্যের প্রচুর দোকান। ফরাসি যেকোনো শহরের তুলনায় কানে পাওয়া যায় পৃথিবীর সেরা সব ব্র্যান্ড। শ্যানেল, শপার্ড, রোলেক্স, প্রাদা, লুই ভুইটনসহ ৭০টিরও বেশি সেরা ব্রান্ডগুলো দিয়ে ছেয়ে গেছে কানের সমুদ্রতীরের ৮০০ মিটারের রাস্তাটি।

 সিঁধেল চোরদের আড্ডা

সিঁধেল নামটি শুনলেও ভাবার কোনো কারণ নেই এরা ছেঁচড়া চোর। যেখানেই অঢেল সম্পদ, সেখানেই হানা দেবে মাফিয়ারা, এটাই স্বাভাবিক। কানেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। শহরের এই রাস্তাটির বুকে লেগে আছে সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক কিছু স্বর্ণ ডাকাতির ইতিহাস। মনে করা হয়, পিংক প্যান্থার ডাকাত দলের একজন ২০১৩ সালে কার্লটন হোটেলে বিখ্যাত হীরা প্রদর্শনী থেকে ১০৩ মিলিয়ন ইউরো দামি রত্ন বাগিয়ে নিয়েছিল। মজার বিষয় হলো, এটাই সব সময়ের জন্য বিশ্বের সেরা ডাকাতি হিসেবে ধরা হয়। একই বছরে চলচ্চিত্র উৎসব থেকে ১.৬ মিলিয়ন ইউরোর নেকলেস চুরি হয়। ২০১৫ সালে উৎসবের কয়েক দিন আগে একটি দোকান থেকে ১৭.৫ মিলিয়ন ইউরোর স্বর্ণ চুরি হয়। কেউ কেউ মনে করতে পারেন, এগুলো সিনেমার সব গপ্পোসপ্পো। তাদের বলি, মাস্টার অব সাসপেন্স আলফ্রেড হিচককের ১৯৫৫ সালের ধ্রুপদি সিনেমা টু ক্যাচ আ থিফ এর কিছু অংশ তিনি করেছিলেন কার্লটন হোটেলের একজন রিভেরা সিঁধেল চোরকে নিয়ে।

 ব্রিটিশদের হাত ছিল

ফরাসি শহর কান। কিন্তু আজকের কানের জৌলুসের পেছনের মূল কারিগর ছিলেন ব্রিটিশরা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এই শহরে দাসব্যবস্থা বিরোধী আন্দোলনের কর্মী ও প্রধান বিচারপতি হেনরি ব্রুম ঘুমন্ত এই জেলেপল্লিকে একটি আধুনিক অবকাশযাপন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। ব্রুমই এ শহরের ব্রিটিশদের মধ্যে ধনী, অভিজাত ও ব্যবসায়ীদের শীতকালীন বাড়ি করতে আগ্রহী করে তোলেন। যুক্তরাজ্যের হাউজ অব কমন্সে এক নাগাড়ে ছয় ঘণ্টা বক্তৃতা করার রেকর্ডটিও তাঁর কাছে।

 ‘ফরাসি হলিউড’

চলচ্চিত্রের উষালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত কানের সাগরতীরের কোতে দ’আজুর সব সময়ই সিনেমাওয়ালাদের জন্য বিখ্যাত। প্রথম চলচ্চিত্রনির্মাতা লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় এখানকার সাগরতীরের ছবি ক্যামেরায় বন্দী করেছিলেন। ১৮৯৭ সালে লুমিয়ের ভাইদের কাজের পরে নির্বাক যুগের কয়েকজন বিখ্যাত পরিচালক এখানকার সাগরতীরকে বেছে নেন শুটিংয়ের জন্য। ছবিতে সবাক যুগ আসার পরেও এই ট্রেন্ড চলমান ছিল। নিস শহরের কাছে দ্য ভিক্তোরিন স্টুডিওগুলো থাকায় এই শহরকে একসময় ‘ফরাসি হলিউড’ বলা হতো। ১৯৪৪ সালে ফরাসি পরিচালক মার্সেল ক্যারনির নির্মিত চিলড্রেন অব প্যারাডাইজ ছবির কিছু অংশ শুটিং করা হয়েছিল এখানে। ছবিটি সর্বকালের সেরা ফরাসি ছবির মর্যাদা পেয়েছে।

আজ ফরাসি শহর কান হয়ে উঠেছে ইউরোপের অন্যতম সম্মিলনের রাজধানী, বিশ্বের সেরা সব টেলিভিশনের বড় বাজার। আর কান চলচ্চিত্র উৎসব? পাম দ’র পুরস্কারের জন্য মুখিয়ে থাকেন সারা দুনিয়ার সিনেমাওয়ালারা।