আজ শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭, ১০:৫৩ অপরাহ্ন logo

বুধবার, ১০ মে ২০১৭, ১২:০০ অপরাহ্ন

এক রবীন্দ্রনাথের ভেতরে বহু রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে বাঙালির চর্চার শেষ নেই। বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে আবিষ্কৃত হয়েছেন তিনি। রবীন্দ্রজয়ন্তীর ক্ষণে সম্প্রতি প্রকাশিত রবীন্দ্রবিষয়ক নির্বাচিত কয়েকটি বই নিয়ে আয়োজন

রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা

প্রকাশক: অবসর, ঢাকা

প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৬

পৃষ্ঠা: ২২৫

দাম: ৪০০ টাকা

_______________________________________________________________________________________________

রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট বিপুল ও বৈচিত্র্যময় জগৎটি বিভাময়, মনে আসে সুকুমার সেন এ প্রসঙ্গে ইন্দ্রধনুর তুলনা টেনেছেন, যেটি আকাশে উদিত হয় আলোর সপ্তবর্ণ ধারণ করে। রবীন্দ্রনাথ নিজে তাঁর উপন্যাস শেষের কবিতায় বিদ্যাকে তুলনা করেছেন হীরকখণ্ডের সঙ্গে আর তা থেকে যে আলো বিচ্ছুরিত হয়, তাকে তুলনা দিয়েছেন সংস্কৃতির সঙ্গে। এ অর্থে রবি কবির শিল্পের জগৎ যে আলোকময়, তার সমর্থন মেলে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখাতেও। রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি শিরোনামের বইয়ে তাঁর কথা, ‘রবীন্দ্রনাথের মূল ভূমিকাটি ছিল সাংস্কৃতিক।’ (পৃ. ১৪) এই মূল ভূমিকার কারণে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঠিকই বলেছেন, ‘তিনি ভারতবর্ষের, বিশ্বেরও বটে, কিন্তু তারও আগে তিনি বাংলার।’ (পৃ. ১৪) প্রাবন্ধিকের সঙ্গে আমরা একমত। তাঁর এই সংস্কৃতিচর্চার মধ্যে বাঙালির জন্য কাব্য, সংগীতসহ সব রসদই ছিল। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ প্রসঙ্গের সমাপ্তি টেনে আত্মগত প্রশ্ন তুলেছেন, ‘বাঙালীর নাটকে, চিত্রকলা, বিজ্ঞানমনস্কতায়, লোকসাহিত্যচর্চায়, ভাষাবিজ্ঞানে কোথায় তিনি ছিলেন না। কোথায় থাকবেন না, অনেককাল?’ (পৃ. ১৪) তিনি বাঙালির জীবন-পথে অগ্রপথিক, বরাবর প্রাসঙ্গিক।

এ-ও খুব সংগত কথা যে ‘সংস্কৃতির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ আমাদেরকে বড় একটি উত্তরাধিকার তুলে দিয়ে গেছেন, সেটা রুচির।’ (পৃ. ১৪) অধ্যাপক চৌধুরী রুচির ভিত্তি হিসেবে গণ্য করেন উচ্চ নৈতিকতাবোধকে, যা তাঁর বিবেচনায়, রবীন্দ্রনাথেরই উত্তরাধিকার। কারণ, ‘নৈতিকতাকে রবীন্দ্রনাথ রুচিতে পরিণত করেছিলেন।’ (পৃ. ১৪)

ফলে রবীন্দ্র প্রসঙ্গে এ কথাও মনে রাখা জরুরি যে তিনি ‘কেবল বৃহৎ নন, বৃহৎ তো তিনি অবশ্যই, তিনি মহৎও।’ (পৃ. ১৩) মহত্ত্বের বোধে জারিত তাঁর সৃষ্ট শিল্প-সাহিত্যকে উপেক্ষা করা দুঃসাধ্য। বরং বিচার করে বারবার খুঁটিয়ে পড়ে বুঝে নিতে হয় কেন রবীন্দ্রনাথ বাঙালির জীবনে, এই বাংলাদেশে, আমাদের জন্য এত জরুরি।

২.

রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি—বাংলাদেশে, বাঙালি জীবনে—তা লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, যিনি বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ-প্রাবন্ধিকই নন, বিশেষভাবে পরিচিত বামপন্থী চিন্তাধারায় সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী একজন অগ্রগণ্য চিন্তাবিদ হিসেবে।

আমরা জানি, এককালে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা বিরূপ সমালোচনার মাধ্যমে জমিদার রোমান্টিক (ভাববাদী) রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রায় খারিজ করে দেওয়ার পক্ষেই ছিলেন। অধ্যাপক চৌধুরী এঁদের মতো একচক্ষু মানুষ নন, এক রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বহু রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্ব তিনি ভালোভাবেই জানেন। গভীর অভিনিবেশ ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে তিনি কবির লেখা ও ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং তাঁর গুরুত্ব, আজও তাঁর প্রাসঙ্গিকতা, তুলে ধরেছেন।

এসব কারণে লেখক প্রধানত তাঁর ইতিবাচক ভূমিকাটুকু বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাই তিনি লেখেন, ‘মার্কসবাদীদের মতো করে ইতিহাসের ব্যাখ্যা রবীন্দ্রনাথের করবার কথা নয়, তা তিনি করেনও নি; কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীদের বিশেষ আগ্রহ যে ভোগবাদিতায় তা তিনি জানতেন এবং সে বিষয়েও লিখেছেন,’ (পৃ. ৩৬)। এ কথাও লিখেছেন, ‘পুঁজিবাদের তৎপরতা রবীন্দ্রনাথের কাছে অস্পষ্ট ছিল না।’ (পৃ. ৩৭) রক্তকরবী নাটকের আলোচনাতেও পুঁজিবাদী শোষণব্যবস্থার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের অবস্থানের কথা এসেছে। (পৃ. ৮৪)

তা বলে সর্বক্ষেত্রে সর্বাবস্থায় রবীন্দ্রনাথকেও অনুমোদন দিয়ে যাওয়া কি সম্ভব? তাঁরও তো সীমাবদ্ধতা কিছু ছিলই—সেটি শ্রেণিগত যেমন তেমনি ব্যক্তিগত, আদর্শগতও বটে।

৩.

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাহিত্যের ছাত্র-অধ্যাপক হলেও তাঁর মূল্যায়নের মূল ভিত্তি সমাজতাত্ত্বিক। এ বইতে সাহিত্যের নান্দনিক বিশ্লেষণ-মূল্যায়নে তিনি আগ্রহী ছিলেন না। তাই হয়তো রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকৃতির প্রধান ও প্রবল দুটি স্রোতস্বিনী—কবিতা ও গান—তাঁর বইয়ের আলোচনার বাইরেই থেকে গেছে।

কিন্তু সমাজতাত্ত্বিকের মন নিয়ে সাহিত্যের বিচার সব সময় সুবিচার হয়নি। ‘কুমুর বন্ধন’ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বিখ্যাত প্রবন্ধ। কুমুর মূল বন্ধনটা কিসের? তা আদতে তার মনের ‘আদর্শিক পুরাতন মহলটি’, যা ‘তাকে নিয়ে যায় ভাববাদের পথে।’ এই পুরাতন মহলটি তার মনের অন্য মহল, যা ‘অমাবস্যাকবলিত’। কিন্তু কুমুর এই সীমাবদ্ধতার দায় বস্তুত কুমুর নয়, সমাজব্যবস্থার। সেটা অধ্যাপক চৌধুরী বোঝেন, তাঁর আলোচনায় সে বাস্তবতার ইঙ্গিত মেলে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অভিযোগের যে সুরটা প্রধান হয়ে ওঠে, তার লক্ষ্য কুমু এবং তার স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ। ফলে অভিযোগটা অসত্য নয় যে রবীন্দ্রনাথ রাজনীতির সেই শক্তিমত্তায় আস্থাশীল ছিলেন না যা শ্রেণিবিভাজনের বিরুদ্ধে বিপ্লবের তেজ নিয়ে দাঁড়ায় এবং প্রয়োজনে সংঘাতে, হানাহানিতে জড়ায়। কিন্তু সাহিত্যের যে শৈল্পিক ও মানবিক বিচার, তাতে কুমুর প্রতিরোধ ও প্রতিবাদে সততার সৌন্দর্য ও শক্তিই যে প্রকাশিত হয়, তা এ আলোচনায় উপেক্ষিত থেকে যায়। কুমু অবিস্মরণীয় চরিত্র হয়ে ওঠে—তার সমাজবাস্তবতার গ্লানি সত্ত্বেও।

ব্যক্তির ওপর সমাজ ও রাষ্ট্রের যে পীড়ন, যে বন্ধনের চাপ তা যে রবীন্দ্রনাথকে পীড়িত করেছে, সে কথা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন। এই সূত্রেই তিনি বলেন, ‘তাঁর গোরা, কুমু, অমল সবাই বন্দী, যেমন বন্দী তাঁর ছোটগল্পের নায়ক নায়িকারা।’ (পৃ. ২০১)। এ অবশ্যই যথার্থ কথা, কিন্তু বিপ্লবী ও বিপ্লবকালে অংশীদার মানুষ ব্যতীত কে নয় তার কাল এবং সমাজবাস্তবতায় (স্থান) বন্দী। অভিযোগ তোলেন লেখক, ‘প্রজারা ও শ্রমজীবীরা কিন্তু নীরব’ (পৃ. ১৬৪) তাঁর উপন্যাসে, কিন্তু তা তো ঘটে আখ্যান ও চরিত্রেরই সামঞ্জস্যের প্রয়োজনে আর তারা সবল সক্রিয়তায় জেগে ওঠে নাটকে। সে-ও আখ্যানেরই সামঞ্জস্যে।

তবে সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষকের মন বলেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী রবীন্দ্রজীবনের উত্তরণটা ধরতে পারেন। রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরের ঐতিহ্যকে গ্রহণ করেও কীভাবে এগিয়ে নেন তার চমৎকার বিবরণী তাঁর লেখাতে তা-ই ফুটে ওঠে: (মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের) ‘জনবিচ্ছিন্নতা, কৃত্রিমতা, সাম্প্রদায়িকতা, শ্রমবিমুখতা, উপনিবেশ-নির্ভরতার যে নঞর্থক বৈশিষ্ট্যগুলো বাঙালী মধ্যবিত্তের জন্ম-দুর্বলতা ও প্রায় আজন্ম সাথী, রবীন্দ্রনাথ সেগুলো থেকে মুক্ত ছিলেন। সঙ্গে ছিল অফুরন্ত সৃষ্টিশীলতা, যে জন্য তিনি অত বড়, অমন মহৎ (পৃ. ২১১)।’