আজ বুধবার, ২৩ অগাস্ট ২০১৭, ১২:৩২ পূর্বাহ্ন logo

শুক্রবার, ১৯ মে ২০১৭, ১২:০৮ অপরাহ্ন

লোকসংস্কৃতি ও নগরসংস্কৃতির ব্যবধানের ফাঁদে পড়েছি আমরা

 

প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আত্মস্মৃতি বিপুলা পৃথিবীর জন্য সম্প্রতি ১৪২৩ বঙ্গাব্দের আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। দেশ, সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে এই আলাপচারিতায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাজ্জাদ শরিফ

_______________________________________________________________________________

নিউজডেস্ক

 

জনতার নিউজ২৪ ডটকম :

সাজ্জাদ শরিফ: অভিনন্দন। আপনি দুবার আনন্দ পুরস্কার পেলেন?
আনিসুজ্জামান: ধন্যবাদ। দুবার আরও অনেকেই পেয়েছেন। আমার ক্ষেত্রে বলতে পারো দেড়বার। ১৯৯৪ সালে প্রথমবার পেয়েছিলাম দুজনে মিলে: আমি আর আমার ছাত্র ও সহকর্মী—এখন লোকান্তরিত—নরেন বিশ্বাস। সেবার পেয়েছিলাম বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রচার ও প্রসারের জন্য। আমরা বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনকাল থেকে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত নির্বাচিত রচনা কিছু অডিও রেকর্ড করে বের করেছিলাম। সেটিকে ওঁরা পুরস্কারযোগ্য বলে বিবেচনা করেছিলেন। এবার আমার স্মৃতিকথার সর্বশেষ খণ্ড বিপুলা পৃথিবীকে তাঁরা সাহিত্য হিসেবে পুরস্কারযোগ্য বিবেচনা করেছেন। এটিই তফাত।
কবি শঙ্খ ঘোষের কাছ থেকে আনন্দ পুরস্কার নিচ্ছেন আনিসুজ্জামান। ছবি: সংগৃহীত

কবি শঙ্খ ঘোষের কাছ থেকে আনন্দ পুরস্কার নিচ্ছেন আনিসুজ্জামান। ছবি:

সংগৃহীতসাজ্জাদ: এত দিন আপনি ছিলেন এ পুরস্কারের অন্যতম বিচারক। এবার হয়ে গেলেন বিচারের পাত্র। কেমন লাগল?
আনিসুজ্জামান: প্রথমবার আনন্দ পুরস্কার পাওয়ার এক বছর পর থেকে একটানা কুড়ি বছর এই বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। তারপর ওই কাজ ছাড়ার পরপরই পুরস্কারটা পেয়ে গেলাম। একেবারে অপ্রত্যাশিত, তবে আনন্দদায়ক।
সাজ্জাদ: পুরস্কার হিসেবে কি আনন্দের কোনো স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে?
আনিসুজ্জামান: আনন্দ পুরস্কারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় বসে যিনিই বাংলা সাহিত্য চর্চা করুন না কেন, এ পুরস্কার তাঁর জন্য উন্মুক্ত। এটা বিশেষ করে কোনো ভারতীয় বা বাঙালির জন্য নয়। এ পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের এডওয়ার্ড ডিমক ও ক্লিনটন সিলি, ব্রিটেনের উইলিয়াম রাদিচে, বাংলাদেশেরও বেশ কয়েকজন। আর কোনো পুরস্কারের এ বৈশিষ্ট্য নেই।
সাজ্জাদ: লজ্জা উপন্যাসের জন্য তসলিমা নাসরিনের আগে বাংলাদেশের আর কেউ এ পুরস্কার পাননি। এমন একটা সমালোচনা আছে যে তসলিমাকে এ পুরস্কার দেওয়ার পরপর যে তীব্র বিতর্ক উঠল, সেটা থেকে বেরোনোর উপায় হিসেবে দ্রুতই তাঁরা ভাবলেন যে বাংলাদেশের আর কাউকে এ পুরস্কার না দিলে নিন্দা ঘুচবে না?
আনিসুজ্জামান: সম্ভবত ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমিকে এ পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার যখন বাংলা একাডেমি নিতে চাইল না, তখন তঁারা তসলিমাকে দিলেন। তসলিমাই বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে প্রথম আনন্দ পুরস্কার পেয়েছে। এর পরে শামসুর রাহমান, নরেন আর আমি পেলাম। তারপর তো অনেকেই পেয়েছেন—আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, বিচারপতি কামালউদ্দীন হোসেন।
সাজ্জাদ: যে বইটির জন্য আপনি পুরস্কার পেলেন, সেটি আপনার আত্মস্মৃতি। গত দুই দশকে বাংলাদেশে অনেকে আত্মস্মৃতি লিখেছেন। বাঙালি মুসলমান হঠাৎ এত আত্মসচেতন হয়ে উঠল কেন? ইতিহাসের একটা প্রেক্ষাপটে নিজেকে রেখে কেন আপনি এমন একটা লেখা লিখতে চেয়েছিলেন?
আনিসুজ্জামান: এর একটা কারণ, আমরা যে সময়টা পার করে এসেছি, সেটা যে গুরুত্বপূর্ণ—এ উপলব্ধি আমাদের মধ্যে ঘটেছে। ফলে সেই সময়টার কথা আমরা লিখে রাখতে চাই। আবুল মনসুর আহমেদ বা আবুল কালাম শামসুদ্দীন যে প্রজন্মের কথা লিখেছেন, আমরা তার পরের প্রজন্মের কথা লিখেছি। এই দুই প্রজন্মই একটা পরিবর্তনের ধারার মধ্য দিয়ে গেছে। বিশের দশক, তিরিশের দশক, চল্লিশের দশক, পঞ্চাশের দশক এবং তারপর অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। সেই সময়ের কিছু আত্মসচেতন মানুষ হয়তো মনে করেছেন, এই পরিবর্তনগুলো লিখে রাখা উচিত।
ব্যক্তি হিসেবে আমি হয়তো গুরুত্বপূর্ণ নই। কিন্তু আমার কালটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে বলেই আমি লিখেছি। এই বিবেচনা থেকেই আমার আত্মকথা সবাই গ্রহণ করেছেন।
সাজ্জাদ: কাল নিরবধি, আমার একাত্তর ও বিপুলা পৃথিবী—পরপর এই তিনটি আপনার ধারাবাহিক আত্মস্মৃতি। নিছক আত্মস্মৃতি নয়, অনেকের সঙ্গে জড়িয়ে চলা একটা সময়ের আখ্যান। বাঙালি জাতির হয়ে ওঠার একটা সামাজিক রেখাচিত্র বইটিতে পাওয়া যায়। কেমন দেখলেন বাঙালির এই দীর্ঘ যাত্রাপথ?
আনিসুজ্জামান: উত্থান-পতন হিসেবেই দেখি। আমরা যদি ১৯৭১ সালকে একটি বিশেষ সময় বলে ধরি—যখন মুক্তিযুদ্ধ হলো, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো—তখন আমরা যে আদর্শ নিয়ে দেশ প্রতিষ্ঠা করলাম, সেটি উত্থানেরই ব্যাপার। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর যা হলো, সেটি পতন। কেননা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা যে জায়গাটিতে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম, সেখানে আর পৌঁছাতে পারলাম না। আজও পারিনি। মৌলিক পরিবর্তনগুলো পঁচাত্তরের পরেই হলো—সংবিধানে হলো, রাষ্ট্রীয় জীবনে হলো। আজ আমরা যে সাম্প্রদায়িকতা দেখছি, ধর্মনিরপেক্ষতার পাশাপাশি যে এখনো রাষ্ট্রধর্ম রয়ে গেছে—এগুলো তো সেই পতনেরই চিহ্ন। একটা প্রশ্ন স্বভাবতই জাগে যে এত কিছুর পর আমরা কি সামনের দিকে এগোচ্ছি, নাকি পিছিয়ে যাচ্ছি। যেমন ধরো, মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার চেয়েছিলাম, এত দিন পর সেটি পেয়েছি। এটা একটা ইতিবাচক দিক। তেমনি আবার রাষ্ট্র যে অনেক বিষয়ে ধর্মীয় মৌলবাদীদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে বা তাদের সঙ্গে একধরনের আপস করছে—এটা একটা দুঃখজনক দিক। ধর্মের নাম করে একদিকে বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধিতার চর্চা চলছে। অন্যদিকে গণজাগরণ মঞ্চের ঘটনা আমাদের দেখিয়েছে যে এ প্রজন্মের তরুণদের আমরা মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে যেমনটা উদাসীন ভেবেছিলাম, আসলে তারা তা নয়। তাদের মধ্যে সেই মূল্যবোধ আছে। পরস্পরবিরোধী কিছু লক্ষণ আমাদের মধ্যে আছে। এই ভাঙা-গড়া আর উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই আমরা যাচ্ছি। এসব মেনে নিয়েই আমরা কীভাবে সামনে এগোতে পারব, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে আমরা ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে কীভাবে তুলে ধরছি, সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধর্মকে যারা রাজনীতির হাতিয়ার করেছে, তারা যেভাবে মানুষের কাছে যাচ্ছে, আমরা সেভাবে পারছি না। এই যে আহমদিয়াদের ওপর আক্রমণ হলো, বাংলাদেশে এটা হবে, তা আমরা কখনো কল্পনা করিনি। বাংলাদেশে েয ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উত্থান হবে তাই বা কে ভেবেছিল! সহজ বুদ্ধিতে অনেকে বুঝতে পারছেন, এগুলো থেকে বেরিয়ে আসা দরকার।
সাজ্জাদ: ১৯৫০ বা ১৯৬০-এর দশকের সংস্কৃতির চর্চা ও আন্দোলনের সুফল রাজনীতির মধ্যে পাওয়া গেল। একদিক থেকে দেখলে তো সাংস্কৃতিক চর্চার ধারা এখন আরও ব্যাপক হয়েছে, ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনীতি তাহলে পশ্চাৎমুখী হয়ে উঠল কেন? ছেদ ঘটল কোথায়, কী কারণে?
আনিসুজ্জামান: পাকিস্তান সৃষ্টির পর আমাদের নেতারা বললেন, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র চাই। পাকিস্তানি আদর্শ তখন আরও জোরালো ছিল। কিন্তু অবাক করা বিষয়, তা থেকে মানুষ সহজে বেরিয়ে এল। আমরা বাংলাদেশের আদর্শ নিয়ে অগ্রসর হলাম। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পরে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা একটা ধর্মীয় চেহারা দেখাতে তৎপর হলেন। সাংস্কৃতিক মহল থেকেও আমরা একটু পিছু হটলাম। সেই সুযোগে ধর্মকে কেন্দ্র করে আদর্শটা মহিরুহের আকার ধারণ করল। ১৯৯০ সালে সামরিক স্বৈরাচারের পতনের পর আমরা আশা করেছিলাম, এমন পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে, যা আমাদের ১৯৭২-৭৩ সালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু আমরা সেটা আজও পারিনি। দেখা গেছে, দেশকে যারা ধর্মীয় রাজনীতির মধ্যে জড়িয়ে ফেলতে চায়, তারা অনেক বেশি সক্রিয়। এই অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কোন লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ হয়েছিল, কীভাবে হয়েছিল—আমাদের নেতাদের তা সবাইকে মনে করিয়ে দিতে হবে।
সাজ্জাদ: এ কথা কি বলা যায় যে আমাদের সংস্কৃতিচর্চার আনুভূমিক বিস্তার ঘটলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এর যোগসূত্র গড়ে ওঠেনি?
আনিসুজ্জামান: এমন সমালোচনা করা হলে সেটা অসংগত হবে না। আমাদের যে সংস্কৃতিচর্চা, সেটা মূলত নগর ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক। বৃহত্তর সাধারণ মানুষের কাছে আমরা একে নিয়ে যেতে পারিনি। আমরা যে গান গাইছি তার কথা বা আমরা যে নাটক করছি তার ব্যঞ্জনার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো মুশকিল। ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করে, তারা সেটা পেরেছে নানারকম ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। সংস্কৃতির এই জনবিচ্ছিন্নতা কীভাবে দূর করা যাবে, সেটা বলা মুশকিল। সে অর্থে বলা যায়, লোকসংস্কৃতির সঙ্গে নগরসংস্কৃতির যে ব্যবধান, আমরা তার ফাঁদে পড়ে গেছি।
সাজ্জাদ: কিন্তু শিল্প, সাহিত্য বা সংস্কৃতির কাছেই তো এই যোগ আমরা প্রত্যাশা করি। আপনার কি মনে হয় আমাদের সাহিত্য বা সংস্কৃতির পক্ষে এখনো সেই যোগসূত্র গড়ে তোলা সম্ভব?
আনিসুজ্জামান: নিশ্চয়ই। আমার তো মনে হয়, সেটা কিছুটা হচ্ছেও। আমি আবার সেই নাগরিক মধ্যবিত্তের কথা বলি। সাহিত্যের মধ্য দিয়ে তাদের কাছে যে বাণী পৌঁছাচ্ছে, সেটা মূলত প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন। কিন্তু পৌঁছানোর একটা সীমা রয়েছে। গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে সেটা পৌঁছাতে পারছে না। এই সাহিত্যের পক্ষে সেটা কঠিন। এটা এক জটিল সমস্যা। শুধু বাংলাদেশের আদর্শের ক্ষেত্রেই নয়, সাধারণভাবে বাঙালি সংস্কৃতির জন্যই এটা একটা বড় সমস্যা। তবে নগরের মানুষ এখন হয়তো আগের চেয়ে বেশি লোকসংগীত শুনছে, আবার টেলিভিশনের মাধ্যমে পল্লির মানুষও নাগরিক সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। এটা ব্যবধান মেটাতে একধরনের কাজ করছে। ইদানীং মাদ্রাসার ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকক্ষ ডিগ্রি পেতে চাইছে। কারণ তারা মনে করছে, যে ডিগ্রি তারা পাচ্ছে, সেটি দিয়ে বর্তমান দুনিয়ায় কিছু অর্জন করা সহজ নয়। সুতরাং একটা সেতুবন্ধন তো হচ্ছে।
সাজ্জাদ: বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে যে টানাপোড়েনের সম্পর্ক, সাহিত্য বা সংস্কৃতি সেখানে কী ভূমিকা রাখতে পারে?
আনিসুজ্জামান: মানুষের মধ্যে যে ভয় ও সন্দেহ, তা অচেনা ও অজানাকে নিয়ে। সাহিত্যের মধ্য দিয়ে আমরা যখন সেই অজানা-অচেনাকে চিনতে পারি, তখন সন্দেহ ও ভয় অনেকটাই কেটে যায়। এ জন্য আমি মনে করি, ভারতের যে অংশে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বাস করে, সেই অংশের মানুষের সঙ্গে বোঝাবুঝি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে দুই অঞ্চলের সাহিত্যই ভূমিকা রাখতে পারে। তা খানিকটা রাখছে বলেও আমি মনে করি।
সাজ্জাদ: এত দিনের আদান-প্রদানে জানা-বোঝার দূরত্ব যতটা কমা দরকার ছিল, ততটা কমেছে বলে কি আপনার মনে হয়?
আনিসুজ্জামান: আমার মনে হয় না, জানা-বোঝা ততটা কমছে না। কিছু বদ্ধমূল সংস্কার এই জানা-বোঝার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে আছে। তবে ধীরে ধীরে এটা দূর হবে বলে মনে করি। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক একটা জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি, যে সমস্যাগুলোর সমাধান হওয়া উচিত ছিল, সেগুলো তো ঝুলে আছেই; বরং নতুন কিছু সমস্যার উদ্ভব হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমরা যত বেশি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই বিরোধগুলো মেটাতে পারব, তত ভালো।
সাজ্জাদ: সাহিত্য-সংস্কৃতি যে কাজটা করে—মানে মানুষে মানুষে যোগ—সেটা কি এখানে অর্থবহ ভূমিকা রাখতে পারে?
আনিসুজ্জামান: নিঃসন্দেহে। প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ভাব রেখেই তো চলতে হবে। এই সদ্ভাবের জন্য দুই পক্ষকেই বলব, পরস্পরকে জানুন এবং যত দ্রুত সম্ভব সমস্যাগুলোর সমাধানে চেষ্টা করুন।
সাজ্জাদ: বাঙালি এখন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। আবার অন্তর্জালের কল্যাণে তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এই পরিস্থিতি কি বাংলা সাহিত্যে নতুন কোনো বৈশিষ্ট্য নিয়ে এল? বিশ্ববাঙালির সাহিত্যচর্চার এই নতুন পটভূমিতে বাংলাদেশের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
আনিসুজ্জামান: একটা জিনিস মনে রাখতে হবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হওয়ার ফলেই কিন্তু বাংলাভাষী মানুষের পক্ষে সারা বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সম্ভব হয়েছে। আগে এটা ছিল না। এর একটা ভালো দিক আছে। অন্য দেশ সম্পর্কে আমরা জানছি। অন্য দিকে, বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের ফলে আমাদের প্রগতির কিছু অন্তরায়ও দেখা দিয়েছে। যেমন মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের বড়সংখ্যক নাগরিক চাকরিবাকরি করছে। দেশে ফেরার সময় তারা ওই দেশের সংস্কৃতিটা সঙ্গে নিয়ে আসছে। বাংলাদেশে যে এখন হিজাব ছড়িয়ে পড়েছে, সেটা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী বাঙালিদের মাধ্যমে। সৌদি আরবে বা মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে তারা ওখানকার সংস্কৃতিকে ইসলামি সংস্কৃতি বলে মনে করছে। তারপর দেশে ফিরে এসে ওই সংস্কৃতির চর্চা করছে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের তাঁতিরা বলেছেন, বাঙালি মেয়েরা শাড়ি কম পরছে। এটা যে ঘটছে, তার কারণ ওই যোগাযোগ। আবার দেশের মানুষ বিদেশমুখী হওয়ায় আমরা অনেক মেধা হারাচ্ছি। অনেক মেধাবী দেশের সঙ্গে সব চুকিয়ে দিয়ে বিদেশে গিয়ে বসবাস করছেন। এটা হয়তো তাঁরা বাধ্য হয়েই করছেন। আবার ওখানে যারা জন্মাচ্ছে, দেশের প্রতি তাদের পূর্বপুরুষের মতো টান না থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে এখন পর্যন্ত প্রবাসী বাঙালিরা দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে আমরা নানাভাবে তার প্রমাণ পাই।
সাহিত্যের ব্যাপারে বলতে হয়, বিষয়ের ক্ষেত্রে আমাদের বৈচিত্র্য অনেক বেড়েছে। এখন আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাঙালির জীবনযাপন প্রণালি জানতে পারছি। সোভিয়েত ইউনিয়নে যাঁরা পড়তে গিয়েছিলেন, সাহিত্যে তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা লিখছেন। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বাড়ছে। এসব তো আগে ছিল না। এভাবে পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের লেনদেনের একটা প্রক্রিয়া চলছে। এটা ইতিবাচক।
সাজ্জাদ: আপনি তো বাঙালির ভালো-মন্দ মেশানো রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা উত্থান-পতন দীর্ঘ সময় ধরে দেখে এলেন। বাঙালির ভবিষ্যৎ কী?
আনিসুজ্জামান: আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাঙালিত্বকে প্রতিষ্ঠা করা এবং বিশ শতকে যেসব উন্নয়ন ঘটেছে—এই শতক তো সবেমাত্র শুরু হলো—তার ফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। এটা করা খুব সহজ নয়, কিন্তু এটা আমাদের করতে হবে। পশ্চাৎপদ যেসব ভাবনাচিন্তা সমাজে আছে, তার সঙ্গে আরও কিছুদিন আমাদের যুদ্ধ করতে হবে।