আজ সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ০২:৫৫ অপরাহ্ন logo

মঙ্গলবার, ৩০ মে ২০১৭, ০১:৩৩ অপরাহ্ন

মন্ত্রীরাও মাঝেমধ্যে সত্য কথা বলেন!

নিউজডেস্ক

 

জনতার নিউজ২৪ ডটকম :

মন্ত্রীরাও মাঝেমধ্যে সত্য কথা বলেন। তাঁরা সব সময় অসত্য বলেন, সে কথা বলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে মন্ত্রীরা উন্নয়নের যেসব ফিরিস্তি দিয়ে থাকেন, তার সঙ্গে বাস্তবের মিল খুব কমই থাকে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গত শুক্রবার নগরের আগ্রাবাদের বিদ্যুৎ ভবনে প্রি-পেমেন্ট মিটার কার্যক্রমের উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেছেন, ‘তিন বছরে লাগালেন (প্রি-পেইড মিটার) এক লাখ। অথচ গ্রাহক আছে সাত লাখ। আগামী বছরের মার্চের মধ্যে সাত লাখ প্রি-পেইড মিটার দেখতে চাই।’ তিনি ওই সভায় মাটির নিচে সাবস্টেশন, ট্রান্সফরমার ও কেব্‌ল স্থাপন প্রকল্প শুরু করতে দেরি হওয়া, প্রি-পেইড মিটার প্রকল্পের ধীরগতি ও গ্রাহকসেবার নিম্নমান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, ‘মাটির নিচে সাবস্টেশন, ট্রান্সফরমার ও কেব্‌ল স্থাপন প্রকল্প বহুদিন আগের। বারবার বলে আসছি, আপনারা এক বছর ধরে হারিকেন দেখাচ্ছেন। বলে আসছেন কনসালট্যান্ট (পরামর্শক) নিয়োগ করছি। এভাবে চলবে না।’

কথাটি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী না হয়ে অন্য কেউ বললে নিশ্চয়ই ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বিদ্যুৎ বিভাগ, তথা সরকারের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করতেন। মন্ত্রী মহোদয় প্রি-পেইড মিটার বসানো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রি-পেইড মিটারই বিদ্যুতের একমাত্র সমস্যা নয়। আরও অনেক সমস্যা আছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার যে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেই জরুরি অবস্থা থেকে দেশ বেরিয়ে আসতে পারেনি। সরকার রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বললেও চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে এখনো যোজন যোজন দূরত্ব রয়েছে। বিদ্যুৎ-সংকটে জনজীবন এখনো বিপর্যস্ত। বিদ্যুতের অভাবে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটার চালু হলে পিডিবির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উপরি আয় কমে যাবে। তখন বিল নিয়ে নয়ছয় করা যাবে না। কারও তিন হাজার টাকার বিল অলৌকিক হাতের ইশারায় তিন শ হয়ে যাবে না। এ কারণে হয়তো মন্ত্রীকে পিডিবির কর্তাব্যক্তিরা এক বছর ধরে হারিকেন দেখাচ্ছেন। তাঁরা যদি খোদ মন্ত্রীকে হারিকেন দেখাতে বা হাতে ধরিয়ে দিতে পারেন, তাহলে সাধারণ গ্রাহকদের কী করতে পারেন, সহজেই অনুমেয়। হারিকেনের সঙ্গে বাঁশেরও একটি যোগসূত্র আছে। আমরা অত দূর গেলাম না। আপাতত হারিকেনেই সীমিত থাকি। বাংলাদেশে এখন সাধারণ মানুষকে হারিকেন দেখানো কিংবা হাতে ধরিয়ে দেওয়া ডালভাত হয়ে গেছে। সরকারি কোনো সেবা নিতে গেলে নাগরিককে পদে পদে বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। মন্ত্রী তবু ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের সেই সুযোগটুকুও নেই।

ক্ষমতার সাড়ে আট বছরের মাথায় এসে বিএনপি আমলের ব্যর্থতার কথা বলে বিদ্যুৎ-প্রত্যাশী মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়া যাবে না। প্রকল্পের কাজের ধীরগতির জন্য মন্ত্রী পিডিবির কর্মকর্তাদের দায়ী করেছেন। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি নিজের দায় এড়াবেন কীভাবে?

যেখানে অধিকাংশ মন্ত্রী উন্নয়নের জোয়ারে বিভোর হয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সব কাজের পক্ষে সাফাই গাইতে পছন্দ করেন, সেখানে এই সত্য ভাষণের জন্য নসরুল হামিদ ধন্যবাদ পেতে পারেন। কিন্তু তাঁর ক্ষোভ কিংবা আমাদের ধন্যবাদে তো বিদ্যুৎ বিভাগের দুর্নীতি, তথা সিস্টেম লস কমবে বলে মনে হয় না। সে জন্য প্রয়োজন বিদ্যুৎ বিভাগে সংঘটিত সব অনিয়ম ও দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা। শুধু মুখের কথায় চিড়ে ভিজবে না।

কয়েক দিন আগে পেশাগত কাজে ঢাকার বাইরের কয়েকটি জেলায় গিয়েছিলাম। সেখানে বিদ্যুতের এই আসি এই যায় অবস্থা। পঞ্চগড়, লালমনির হাট ও চুয়াডাঙ্গায় আমাদের অনুষ্ঠান করতে হয়েছে জেনারেটরের সাহায্যে। বুড়িমারী উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর। সেখানকার ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা জানালেন, চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে একনাগাড়ে ছয় দিন বিদ্যুৎ ছিল না। বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কম্পিউটারাইজড স্থলবন্দরের কাজকর্ম সারতে সরকারের পক্ষ থেকে যে পরিমাণ ডিজেল সরবরাহ করা হয়, তা দিয়ে মাসের অর্ধেক সময়ও চলে না।

তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, বিদ্যুৎ খাতে যে এত উন্নতি হলো, তা গেল কোথায়? ক্ষমতার প্রায় সাড়ে আট বছর পরও কেন মন্ত্রীকে আক্ষেপ করে বলতে হয়, ‘আপনারা আমাকে এক বছর ধরে হারিকেন দেখাচ্ছেন।’ হারিকেন তাঁরা কেবল মন্ত্রীকে দেখাচ্ছেন না, পিডিবিতেও লালবাতি জ্বালাচ্ছেন।

মন্ত্রীর এই আক্ষেপ বা সতর্কবার্তা দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে পারবে কি না, সেটি নির্ভর করছে নিচের প্রশ্নের সদুত্তরের ওপর? এক, যাঁরা মন্ত্রীকে হারিকেন দেখিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কি তিনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন? পিডিবিতে কালো বিড়াল আছে কি না জানি না, তবে বিল আর সিস্টেম লসের ভূত যে আছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এই ভূত তাড়াতে না পারলে মন্ত্রীর হুঁশিয়ারি নিষ্ফল রোদন হতে বাধ্য। আবার অনেকের মতে, বিদ্যুতের সংকট অনেকটা কৃত্রিম। রামপাল কেন্দ্রে উৎপাদন শুরু হলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে?

নসরুল হামিদ সাহেব আরও একটি সত্য কথা বলেছেন। যে গ্রাহকদের অর্থে পিডিবির বড় ও ছোট কর্তারা বেতন নিয়ে থাকেন, সেই গ্রাহকদের প্রতি ভালো আচরণ করেন না। নির্বাহী প্রকৌশলীকে টেলিফোন করলে তাঁর পিয়ন জবাব দিয়ে দেন। স্বভাবতই প্রশ্ন আসবে, এই দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রী হিসেবে তিনি কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?

সবশেষে মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে একটি আশঙ্কার কথা না বলে পারছি না। ক্ষমতার সাড়ে আট বছরের মাথায় এসে বিএনপি আমলের ব্যর্থতার কথা বলে বিদ্যুৎ-প্রত্যাশী মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়া যাবে না। প্রকল্পের কাজের ধীরগতির জন্য মন্ত্রী পিডিবির কর্মকর্তাদের দায়ী করেছেন। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি নিজের দায় এড়াবেন কীভাবে?

জ্বালানি মন্ত্রণালয় বিদেশ থেকে তেল আমদানির নামে জনগণের পকেট থেকে যে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, সেটিও তারা নীরবে মেনে নিচ্ছে, কিন্তু লোডশেডিংয়ের অত্যাচার বেশি দিন মানবে না। কানসাট কিংবা শনির আখড়ার কথা একবার স্মরণ করুন।