আজ রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৬:০৬ পূর্বাহ্ন logo

বৃহস্পতিবার, ১৮ মে ২০১৭, ০৩:১৬ পূর্বাহ্ন

দো-আঁশলা গণতন্ত্রে ধর্ম ও রাজনীতি

নিউজডেস্ক

 

জনতার নিউজ২৪ ডটকম :

বাংলাদেশ অ্যা পলিটিক্যাল হিস্টরি সিন্স ইন্ডিপেন্ডেন্স নামে একটি বই বেরিয়েছে ২০১৬-এর শেষ দিকে। লন্ডন ও নিউইয়র্ক থেকে একযোগে এটি প্রকাশ করেছে আইবি টরিস নামের প্রকাশনা সংস্থা (বাংলাদেশে এনেছে করিম ইন্টারন্যাশনাল)। বইটির লেখক যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আলী রীয়াজ। বাংলাদেশের রাজনীতি, ধর্মীয় উগ্রবাদ, মাদ্রাসাশিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর আরও কয়েকটি বই আছে। কিন্তু এই সর্বসাম্প্রতিক বইটিতে রাজনৈতিক অনেক ধাঁধার উত্তর পাওয়া যায়। আওয়ামী লীগের সাধারণভাবে প্রচলিত ভাবমূর্তি এবং বাস্তব কার্যকলাপের কথিত বৈপরীত্যের ব্যাখ্যা বইটিতে বেশ স্পষ্ট।

অধ্যাপক রীয়াজ তাঁর বইয়ে লিখেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম ৪২ বছরে দেশটির রাজনৈতিক দৃশ্যপট তিনটি আঙ্গিকে ডানপন্থার দিকে ঝুঁকেছে। প্রথমত, নতুন নতুন রক্ষণশীল দলের জন্ম হয়েছে, দ্বিতীয়ত, বামপন্থী দলগুলো ক্রমেই দুর্বল হয়েছে এবং তৃতীয়ত, প্রধান দলগুলো সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রক্ষণশীল নীতি গ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তনের সূচনা ১৯৯১ সালের পর। তখন থেকে দলটি ইসলামি বক্তব্য এবং বিভিন্ন স্মারক (যেমন ব্যক্তিগত পরিধেয় পোশাক) ব্যবহার করতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের শাসনামলে দেশে ইসলামি শিক্ষার উন্নয়নে নেওয়া পদক্ষেপ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামি সম্মেলন সংস্থাতে (ওআইসি) যোগ দেওয়ার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে আওয়ামী লীগ দাবি করে যে তারা বাংলাদেশে ইসলামের সুরক্ষায় নিয়োজিত। তা ছাড়া, ১৯৯১-এর পর সংসদে বিরোধী দলের আসনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও দলটির ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। সে সময়ে প্রশ্ন উঠেছিল, একটি বামঘেঁষা বা মধ্যপন্থী দল তার অবস্থান বদলালে নির্বাচনে জিততে পারবে? ১৯৯৬-এর নির্বাচনী সাফল্যে সে প্রশ্নের একটা জবাব আওয়ামী লীগ পেয়েছে (অধ্যায়: পলিটিক্যাল পার্টিজ, ইলেকশন্স অ্যান্ড পার্টি সিস্টেম)।

দেশের রাজনীতি প্রধানত দুটি ধারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকেন্দ্রিক হওয়া সত্ত্বেও, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জোট গঠনের প্রবণতারও একটা চমৎকার বিশ্লেষণ রীয়াজ করেছেন। মূলত পাকিস্তান আমলেই যে এই জোট গঠনের রাজনৈতিক চর্চা শুরু হয়েছিল, তা উল্লেখ করে তিনি নব্বইয়ে সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পরের জোটগুলোর নানা সমীকরণের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরেছেন এবং সেখানেই তিনি স্মরণ করেছেন ২০০৬ সালে খালেদা জিয়াবিরোধী রাজনৈতিক জোটকে আরও সম্প্রসারণের জন্য আওয়ামী লীগ একটি ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে সমঝোতা করতেও পিছপা হয়নি। তাঁর এই বই থেকেও হিসাব পেলাম যে ১৯৯২ থেকে ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর—এই ১২ বছরে নাকি ৩২টি জোট গড়ে উঠেছিল এবং এর কোনো কোনোটির আয়ু ৩০ দিনও ছিল না। তবে জোটগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয়েছে বড় দলকেন্দ্রিক—আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন অথবা বিএনপির নেতৃত্বাধীন। রাজনৈতিক দল ও ব্যবস্থার মূল্যায়ন করে অধ্যাপক রীয়াজ যে উপসংহার টেনেছেন, তা গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেককেই উদ্বিগ্ন করে তুলতে পারে। তাঁর মতে, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ বহুদলীয় ব্যবস্থা থেকে একদলীয় ব্যবস্থায় এবং একদলীয় ব্যবস্থা থেকে আবারও বহুদলীয় ব্যবস্থায় ফিরলেও ২০১৫তে ইঙ্গিত মিলছে একটি দলের প্রাধান্যনির্ভর ব্যবস্থার উদ্ভবের।

বইটিতে সাতটি অধ্যায়ে রীয়াজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নৈর্ব্যক্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে তিনি ওই প্রশ্নকেও বিচার করেছেন যে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি কতটা রাজনৈতিক আর কতটা সাংস্কৃতিক। শ্রেণিসংঘাতের প্রশ্নও এসেছে। ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্ন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে পূর্ব বাংলার শোষণের ভাষ্য শহরের অভিজাত শ্রেণি এবং গ্রামীণ জনগণকে কীভাবে এক কাতারে শামিল করেছে, তারও একটি ব্যাখ্যা এতে রয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যে রাজনৈতিক বিতর্কের অবসান ঘটাতে আদালতের হস্তক্ষেপ ঘটেছে, সেই বিতর্কিত ইতিহাস বর্ণনা থেকেও তিনি পিছিয়ে যাননি। উভয় পক্ষের যুক্তি এবং দলিলপত্র উদ্ধৃত করে তিনি দেখিয়েছেন, এই বিতর্কে কেন এত রাজনৈতিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য এবং অত্যন্ত রহস্যাবৃত অধ্যায় হচ্ছে সামরিক শাসনের কাল—বিশেষত, প্রথমবারের সেনাশাসন, যে সময়টিতে প্রধানত জেনারেল জিয়াউর রহমানই ছিলেন চালকের আসনে। অভ্যুত্থান এবং পাল্টা-অভ্যুত্থানের পেছনের অনেক কাহিনিই দেশবাসীর অজানা। তার চেয়েও বেশি অজানা দেশের অন্যতম একটি রাজনৈতিক দল—জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলে (জাসদ) সেনানিবাসকেন্দ্রিক রাজনৈতিক তৎপরতার খুটিনাটি। অধ্যাপক রীয়াজ তাঁর শিক্ষকতা জীবনে ফেরার আগে বেশ কিছুদিন সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। বিবিসিতে কাজ করার সুবাদে বাংলাদেশের সামরিক অভ্যুত্থান এবং পাল্টা-অভ্যুত্থানের বিষয়ে কিছুটা অনুসন্ধানী কাজ করার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন। তাঁর এই বইয়ে সেই গবেষণালব্ধ অনেক তথ্যই উঠে এসেছে। প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান দেওয়া জাসদের যে অতীত ইতিহাস, সে বিষয়ে একটা স্পষ্ট ধারণা পেতে হলে ইতিহাস জানতে উৎসুক যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্য এই বই অবশ্যপাঠ্য।

সদ্য স্বাধীন দেশে সবার অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা কীভাবে প্রথম ধাক্কা খায়, একদলীয় বাকশাল চালু, বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ড, সামরিক শাসন জারি, সাবেক সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের গণভোট, সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চালু, আওয়ামী লীগের সংসদে ফিরে আসা, জিয়া হত্যা এবং জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা দখল এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাক্রম তিনি বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করেছেন দ্য রাইজ অ্যান্ড ডিমাইজ অব অথরিটানিয়াজম অধ্যায়ে। জেনারেল এরশাদের পতন যে আশাবাদ ও সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, তাকে অনেকেই উচ্ছ্বাসভরে দ্বিতীয় স্বাধীনতা হিসেবে অভিহিত করেছিলেন উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ১৯৭১-এ জন্মলাভের পর থেকে যেসব সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃত্ববাদ জাতির ঘাড়ে ভর করেছিল, এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তার অবসান ঘটে।

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের তৃতীয় দশক শুরু হয়েছিল প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের উন্মেষ ঘটিয়ে, যখন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে একটি বেসামরিক সরকার গঠিত হয়। সেই মেয়াদে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছিল একটি বড় রূপান্তর, যে ব্যবস্থা ২০০৬ সাল পর্যন্ত একটানা বহাল ছিল। একটি অভ্যুত্থানের চেষ্টা সত্ত্বেও নিয়মিত বিরতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ছিল ওই সময়ের ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-এর নির্বাচন বর্জন, দুই প্রধান দলের অব্যাহত রেষারেষি, ইসলামপন্থী জঙ্গিবাদের উত্থান এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমে দুর্বল হতে থাকার পরিণতিতে ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সংকট চরম রূপ নেয়। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যক্রম, ২০০৮-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচন, আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় এবং বিএনপির নাটকীয় ভরাডুবির কারণগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণও রয়েছে এই অধ্যায়ে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির অঙ্গীকার কীভাবে তরুণ সম্প্রদায়কে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং আওয়ামী লীগ তার সুফল পেয়েছে, তিনি তা তুলে ধরেছেন তাঁর লেখায়।

বাংলাদেশ অ্যা পলিটিক্যাল হিস্টরি সিন্স ইন্ডিপেন্ডেন্স বইটিতে অবশ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একধরনের আশাহত মনোভঙ্গির আভাস পাওয়া যায়। ১৯৯১ থেকে ২০১৫-এর সময়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করে তিনি দেখিয়েছেন, গণতন্ত্রের যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল, সেখান থেকে কীভাবে শুরু হয়েছে উল্টোপথে চলা। তিনি সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আত্মাহুতি দেওয়া তরুণ নুর হোসেনের মায়ের ২০১০ সালের একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে মরিয়ম বিবি বলছেন, ‘আমার ছেলে যে জন্য মরলো আমি এখনও তার কিছুই দেখি না।’

দেশের বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থার সংজ্ঞায়নে আমরা প্রায়ই ধন্দে পড়ে যাই। ক্ষমতাসীনেরা জোর গলায় দাবি করেন, দেশে পূর্ণমাত্রায় সংসদীয় গণতন্ত্র রয়েছে। আর সমালোচকেরা বলেন, দেশে কার্যত কর্তৃত্ববাদী শাসন চলছে। সংসদের বাইরে থাকা বিরোধী দল বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়া, যিনি সরকার পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করায় ভূমিকা রেখেছেন, তিনিই এখন এই ক্ষমতা কমিয়ে ভারসাম্য আনার প্রস্তাব করেছেন। তাঁর সদ্য পেশ করা ভিশন ২০৩০-এ সে রকমটিই প্রস্তাব করা হয়েছে। এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যায় অধ্যাপক রীয়াজের বই অনেকটাই সহায়ক হতে পারে।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সুমপেটার, হান্টিংটন, প্রেৎজোভস্কি, ও’ডনেল, ডাল প্রমুখের গণতন্ত্রের সংজ্ঞা তুলে ধরে তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন, তাঁর মাতৃভূমির অবস্থানটি কোন জায়গায়। তবে তাঁর বিবেচনায় গণতন্ত্রের যেসব উপাদান অত্যাবশ্যকীয়, সেগুলো হচ্ছে ১. সর্বজনীন ভোটাধিকার, ২. নির্বাহী ও আইনসভার পদসমূহের জন্য নিয়মিত, অবাধ, প্রতিযোগিতামূলক, বহুদলীয় নির্বাচন এবং ৩. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠন ও সমাবেশ করার অধিকারসহ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারগুলোর স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্রের সব প্রতিনিধি ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সত্যিকার আইনগত সমতা ও আইনের শাসন। এগুলোর কোনো একটিকে বাদ দিয়ে গণতন্ত্র পূর্ণতা পেতে পারে না। বাংলাদেশের বিদ্যমান ব্যবস্থা কি তাহলে উদার গণতন্ত্র? নাকি নির্বাচনী গণতন্ত্র? কিংবা ন্যূনতম গণতন্ত্র? নির্বাচনী প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, সরকারের কার্যক্রম, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠন ও সমাবেশের অধিকার, আইনের শাসন এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার গুণগত মান বিবেচনার ভিত্তিতে তাঁর মূল্যায়নে বাংলাদেশে এখন যে ব্যবস্থা চলছে তা হচ্ছে, দো-আঁশলা গণতন্ত্র, ইংরেজিতে হাইব্রিড ডেমোক্রেসি। তাঁর কথায় এই দো-আঁশলা গণতন্ত্রকে না বলা যায় গণতান্ত্রিক, না বলা যায় কর্তৃত্ববাদী। সেই দোঁ-আশলা গণতন্ত্রে দ্বিদলীয় নির্বাচনী রাজনীতিতে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব যে বাড়বে, তাতে আর বিস্ময় কি?