আজ সোমবার, ২৬ Jun ২০১৭, ০৯:২৫ অপরাহ্ন logo

শনিবার, ২৭ মে ২০১৭, ০৩:১৮ অপরাহ্ন

বৈরি তাপমাত্রায় বিপর্যস্ত প্রকৃতি

নিউজডেস্ক

 

জনতার নিউজ২৪ ডটকম :

শীতের সময় কষ্ট। আবার গরমের সময় তপ্তস্রোতের জ্বলুনি। এবার শীত কয়েকদিনের জন্য নাড়া দিয়ে গেলেও সুস্বাদু খেজুর রসের দেখা মেলেনি। গাছের অভাবে রসের জোগান প্রায় নেই বললেই চলে। তারপর আছে নিপাহ ভাইরাসের আতঙ্ক। শীত আর খেজুরের রস যেন একে অন্যের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের বাধনে বাঁধা। একটা ছাড়া অন্যটা বিস্বাদ মনে হয়। শীতের সকালে বাতাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধূসর ধুলোর কুণ্ডলি ছেয়ে যায় চারপাশ। বাতাসের হাবভাব আর শীত-গরমের তাপমাত্রা দেখে বোঝার উপায় থাকে না আগামীকাল শীত পড়বে নাকি গরম। এবারের শীত দেখে হতভম্ব হতে হয়, তাপমাত্রার কেন এমন তারতম্য!
ঋতু অনুযায়ী শীতের স্বাভাবিক নিয়ম হল নভেম্বরের শেষে কুয়াশা একটু একটু কমবে। তারপর বৃষ্টির সম্ভাবনা। আর এ বৃষ্টিতে কুয়াশা কেটে যাওয়াই স্বাভাবিক। পশ্চিমের বাতাসের গতি ক্ষীণ হবে এবং উত্তরের বাতাস বৃদ্ধি পাবে। সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণের জলীয়বাষ্প বাতাসে ঢুকে শীত স্বাভাবিক রাখবে। এতে তাপমাত্রার বড় ধরনের কোনো তারতম্য হবে না। অথচ এবারের অবস্থা ভিন্ন, উত্তরের হাওয়া এবং দক্ষিণের জলীয়বাষ্প আচমকা বৃদ্ধি পাওয়ায় শীতের স্বাভাবিকতায় ছন্দপতন ঘটেছে।


তাপমাত্রা কম বেশির কারণে বিপর্যস্ত হয়েছে জীবজগৎ। গ্রীষ্মের সময়ে ৪০ ডিগ্রির ওপরে আবার শীতের সময় ৭ ডিগ্রির নিচে তাপমাত্রার কারণে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাধারণত মাছ চাষে এবং পশুপাখির জীবনে ঠাণ্ডা-গরম প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। প্রাকৃতিক মাছের কথা বাদ দিলে কার্পজাতীয় মাছ চাষে তাপমাত্রা ওঠানামা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে তেলাপিয়া এবং পাঙ্গাস মাছের ক্ষেত্রে ১৫ ডিগ্রির নিচের তাপমাত্রা যেমন অসহনীয়, আবার ৪০ ডিগ্রির ওপরের তাপমাত্রাও তেমনই।

ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দিন দিন বাড়ছেই। সাধারণত বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই অক্সাইড ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রায় প্রভাব ফেলে জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার। এতে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে। যার কারণে ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা দিন দিন বাড়ছে। সূর্যালোকের বিকিরণ শোষণের ক্ষমতা শুধু কার্বন ডাই অক্সাইডের রয়েছে। আবার এই অক্সাইডের অণু অতিমাত্রায় সক্রিয় হলে তা তাপমাত্রাকে শোষণ করে মহাকাশে বিলীন করতে বাধা সৃষ্টি করে। এ কারণেই আর্দ্রতা এবং জলীয়বাষ্প যুক্ত হয়ে ভূমিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে। এভাবে ভূমির শীত বা ঠাণ্ডাভাব আটকে যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন ভূপৃষ্ঠের বায়ুমণ্ডল গরমের জন্য কার্বন ডাই অক্সাইডের অণুকণা ৪৯ ভাগ দায়ী। যদি অন্যান্য কারণ অনুসন্ধান করা যায় তবে দেখা যায়, বায়ুতে তেমন মিথেন গ্যাস নেই কিন্তু কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার দিন দিন বেড়েছে ব্যাপক হারে। যে কারণে মিথেন গ্যাসের আনুপাতিক পরিমাণ বেড়েছে। উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য মিথেন গ্যাস ১৮ ভাগ দায়ী। জলীয়বাষ্প এবং ওজন গ্যাস দায়ী ১৩ ভাগ, নাইট্রোজেনের বিভিন্ন অক্সাইড দায়ী ৬ ভাগ, ক্লোরো-ফ্লোরো কার্বন বা সিএফসি দায়ী ১৪ ভাগ। সিএফসি গ্যাস স্ট্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছে ওজন স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি ভূপৃষ্ঠে পড়ছে। ফলে উত্তপ্ত হচ্ছে ভূপৃষ্ঠ। যে কারণে অতি গরম এবং অতি শীত দুই কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীবজগৎ। জীবের জন্য বসবাস অযোগ্য হয়ে উঠছে পৃথিবী।

সাম্প্রতিক সময়ে দূষণের ফলে বাতাসে জমা হচ্ছে কালো মেঘের মতো স্তর, যা দেখতে অনেকটা বাদামি রঙের। কুয়াশার সঙ্গে কার্বন ঝুল মিশে তৈরি হয় এ স্তর। এ স্তর মাঝ আকাশে সূর্যের আলো শোষণ করে নেয়ার ফলে সেখানেই আলো প্রতিফলিত হয়। ফলে আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্য বদলে যায়। এতে আলোর পরিমাণ কম এলেও তা তাপ পৃথিবীকে উষ্ণ করে তোলে। যে কারণে গরমের সময়ে প্রচণ্ড গরম অনুভূত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা মত দিয়েছেন এ ঝুল হল ভাসমান কার্বন কণা, যা এরোসল নামে পরিচিত। এ এরোসলের কারণে ঋতুগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জীবের শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি হয় এবং দুরারোগ্য ব্যাধি শরীরে বাসা বাঁধে। আমাদের দেশে পরিবেশগত বিভিন্ন দূষণের কারণে অনেক ভাসমান ধূলি কণার সৃষ্টি হয় যা বাতাসের জলীয়বাষ্পের সঙ্গে মিশে জন্ম দেয় এরোসলের। স্বাভাবিকভাবে এ এরোসল ভূপৃষ্ঠে শীতলতা সৃষ্টি করে ঠিকই কিন্তু কখনও কখনও এটা ভূপৃষ্ঠকে গরমও করে তোলে। এ বিষয়ে ভারতের বেঙ্গালুরের আইআইএসসির পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. জে নিবাসন বলেছেন, এরোসলে পৃথিবী ঠাণ্ডা হয়ে যায়। আবার কালো ঝুলে সৃষ্ট এরোসল এই ঠাণ্ডাভাবকে শুষে নিয়ে পৃথিবী উত্তপ্ত করে তোলায় গরম হয়ে ওঠে। এতে ঋতু তার বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে। এ অবস্থায় দিনে দিনে শ্বাসকষ্টের এবং দুরারোগ্য রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৮ থেকে ১৮-তে উঠেছে। পৃথিবীর এ পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে তা জীবের বসবাসের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। আবার বাতাসের দূষিত কণার প্রভাবে সময়ে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। সাধারণত বাতাসে ভাসমান ১০ মাইক্রোন বা তার কম আকৃতির ভাসমান কণা খালি চোখে দেখা মেলে না। ভারতীয় উপমহাদেশে বর্ষার আগেই ওই ধূলি কণা বেশি বেশি বাতাসে ভেসে বেড়ায়। তবে প্রাকৃতিগতভাবে সৃষ্ট ধূলি কণা যতটা না পরিবেশকে ক্ষতি করে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করে মানবসৃষ্ট ধূলি কণা, যা কিনা আসে বিভিন্ন যানবাহনের ধোঁয়া, জ্বালানি, বিভিন্ন শিল্প, তাপবিদুৎ কেন্দ্রসহ নানা উৎস থেকে।

বৃষ্টির বিষয়ে নিবাসন আরও বলেন, সূর্যালোক ধূলি কণার কারণে মাঝ পথ থেকে ফেরত যাওয়ায় মেঘ দু’ভাবে বাধা পেয়ে ঘনীভূত হতে পারে না। প্রথমত, আলোর অভাবে পুকুর, ডোবা, নদী, সমুদ্র, কোনো জলাশয় হতে বাষ্প তৈরি হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, বায়ুমণ্ডলর মধ্যভাগ খুব বেশি গরম হয়ে যাওয়ায় মেঘ সৃষ্টি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। আর এ প্রভাব পড়ে ভূপৃষ্ঠের আবহাওয়াতে। যে কারণে আমাদের দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ কমে যায়। এতে জীবজগতে যেমন অস্থিরতা বাড়ে, তেমনি ফসল উৎপাদনেও ক্ষতি হয়। কেননা দেশে জ্যৈষ্ঠ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত বছরের মোট বৃষ্টির ৮০ ভাগ হয়ে থাকে। এরপর কার্তিক থেকে মাঘ পর্যন্ত বৃষ্টি হয় মাত্র পাঁচ ভাগ। তবে ফাল্গুন হতে বৈশাখ এই তিন মাসে বৃষ্টির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫ ভাগ।

অতিরিক্ত গরম-শীত জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। এমনিতেই বৈরী আবহাওয়ায় প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে প্রকৃতি। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে মানবসৃষ্ট কারণ। আমাদের সুন্দর পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখতে অবশ্যই এর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।