নতুন বছরের প্রত্যাশা

সোর্স:

লীনা পারভীন

২০২০ সালটি কোথা দিয়ে চলে গেলো টেরই পেলাম না। মনে হচ্ছে যেন ঘুমিয়ে ছিলাম আর চোখ খুলে দেখি বছর নাই। ২০১৯-এর ডিসেম্বরে চীনে প্রথম করোনার জন্ম হলো। তারপরও জেগেছিল বিশ্ব। ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটে আলোকিত হয়েছিল এই পৃথিবী। ২০২০-এর জন্ম যেন করোনাকে সাথে নিয়েই হয়েছিল। এর আগে আর কোনও নতুন বছরের লেখা অশুভ কাহিনি দিয়ে শুরু হয়নি। ২০২০-এর শেষের অপেক্ষায় ছিলাম আমরা। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসে গেলো। আবারও লিখতে বসলাম আরেকটি নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে।

নানাবিধ অনিশ্চয়তার মাঝেই শুরু হতে যাচ্ছে আরেকটি বছর। জাগতিক নিয়মেই প্রবেশ করবো নতুন বছরে। পুরনো বছরের সালতামামি লেখা হয়। আমার জীবদ্দশায় এই প্রথম সম্ভবত কোনও সালতামামিতে কেবল করোনার কথাই লেখা হবে। সাধারণ একটি বছরের মূল্যায়ন ও নতুন বছরের প্রত্যাশা লিখতে গিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় আনা হয়। মাঝে থাকে ব্যক্তিগত পর্যালোচনাও। ২০২০ সালে করোনা মোটামুটি আমাদের সকল খাতেই আঘাত হেনেছে। তারপরও গোটা বিশ্বের তুলনায় করোনা মোকাবিলায় আমাদের সাফল্য অনেক এগিয়ে। দুর্বল স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও কেবল নেতৃত্বের কারণে আমরা করোনার ক্ষয়ক্ষতিকে সামলে নিতে পেরেছি। বিশ্বের সেরা স্বাস্থ্য সুবিধাভোগী দেশগুলো মৃত্যুর মিছিল সামলাতে হিমশিম খেয়েছে। অসহায় কান্নাও দেখেছি অনেক দেশের নেতাদের। সেদিক থেকে বাংলাদেশ অনেক সুবিধাজনক অবস্থায় অবস্থান করছে।

কিন্তু এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই যে করোনা না এলে আমাদের স্বাস্থ্য খাতের এই নগ্ন চেহারা হয়তো সামনে আসতো না। দুর্নীতির সবচেয়ে জঘন্য উদাহরণ ছিল স্বাস্থ্য খাতে। করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য সুরক্ষার আইটেম ও করোনা পরীক্ষা নিয়ে যে জঘন্য কর্মকাণ্ড চলেছে, এই লজ্জা জাতি হিসাবে আমাদের অনেক দিন পোড়াবে। যারা মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা করেছে তাদের উপযুক্ত শাস্তির প্রতীক্ষায় থাকবো ২০২১ সালেও। আশা করবো ২০২১-এ আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দুর্নীতিমুক্ত করে বিশ্বমানের করার উদ্যোগ নেবে সরকার।

অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আমরা যতটা পিছিয়ে যাওয়ার কথা ছিল ততটা কিছুই হয়নি; বরং জিডিপির হিসাবে আমরা এগিয়েছি অনেক। মানব উন্নয়ন সূচকে আমরা উপরের দিকে আছি। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর সব স্প্যান বসে গেছে। সম্পূর্ণ নিজের অর্থায়নে বাংলাদেশের মতো একটি দেশ একটু সেতু বানিয়েছে, এ এক চরম বিস্ময়। বাংলাদেশকে একসময় বলা হতো তলাবিহীন ঝুড়ি। সেই ঝুড়িতে এখন কেবল তলাই লাগেনি, বরং নানা ধরনের ফলাহারও শোভা পাচ্ছে। এই ঝুড়িতে এখন সফলতার ফুলবাহার।

 

বিশ্বের সফল ও আলোচিত নারী নেতৃত্বের তালিকায় উপরের দিকে শোভা পায় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নাম। নেতৃত্বের কারণেই একটি দেশ এগিয়ে যায় বা পিছিয়ে যায়। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে কেবল একজনের একক নেতৃত্বের কারণে।

রাজনীতির মাঠে তেমন কোনও উত্থান-পতন না থাকলেও বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল মৌলবাদের আস্ফালন। জামাতের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হলেও তারা খোলস পালটে এখন রাজনীতি করছে হেফাজতের মতো কয়েকটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ওপর ভর করে। ধর্মানুভূতির নামে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে মারা হয়েছে মানুষ। ধর্মের দোহাই দিয়ে ভাস্কর্য ও মূর্তির রাজনীতি নিয়ে মাঠ গরম করার চেষ্টা করা হয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে জাতির পিতার ভাস্কর্য ভাঙার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছে মৌলবাদের এজেন্টরা। আমরা আশা করবো সরকার মৌলবাদের প্রতি নমনীয় না হয়ে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করবে। স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। বর্তমান সরকারে থাকা আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার নেতৃত্বে দেওয়া দল। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া এই দলটির সামান্য বিচ্যুতি আমাদের ভাবায়। বঙ্গবন্ধু কখনও কোন অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। মৌলবাদের বিরুদ্ধে তাঁর ছিল শক্ত অবস্থান। তাই আমরা এই আশা করি আওয়ামী লীগ কখনও মৌলবাদের সঙ্গে আপস করবে না। আপস করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
এই যে মৌলবাদের আস্ফালন, এর পিছনে একটাই কারণ। আর সেটা হচ্ছে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া। প্রগতিশীল মানুষগুলো এখন লড়াইয়ের মাঠে অনুপস্থিত। তরুণ সমাজকে টার্গেট করে মৌলবাদীরা তাদের গোটা কৌশল ডিজাইন করছে। মগজে কুসংস্কারকে ঢুকিয়ে দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে দ্বিধাবিভক্ত এক গোষ্ঠী, যারা কোনও বিষয় বিবেচনায় যুক্তির চেয়ে কুযুক্তিকে প্রাধান্য দিচ্ছে বেশি। এর সুযোগ নিয়ে গুজবের রাজনীতিকে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা ব্যবস্থাকে যদি ঢেলে সাজানো না যায় তবে আগামীর বাংলাদেশ হয়তো আমাদের আশানুরূপ নাও হতে পারে। আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও সুচিন্তিত কাঠামোভিত্তিক একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থাই পারে একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে। বিশ্বায়নের যুগে আমাদের পিছিয়ে থাকলে চলবে না। মাদ্রাসা শিক্ষাকে নজরদারিতে এনে সেখানে প্রতিষ্ঠা করতে হবে আধুনিক মনন গঠনের প্রক্রিয়া। ডিজিটাল মিডিয়ার বিস্তৃতি সরকারেরই অবদান অথচ এই মিডিয়াকে ব্যবহার করে সরকারের বিরুদ্ধে চালানো হয়েছে নানা প্রচারণা। এই ধরনের অনলাইন গুজবকারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আর কোনও ব্যতিক্রম নাই। সাইবার জগতের লড়াইকে আরও বিবেচনার সঙ্গে নিতে হবে। মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে অনলাইনের লড়াই এখন অনেক বেশি কার্যকর।
করোনা কেড়ে নিয়েছে আমাদের অনেক মেধাকে। আনিসুজ্জামান স্যারদের মতো জাতির সম্পদকে হারিয়ে আমরা অনেকটাই মেধাশূন্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এই ক্ষতি আর অন্য কোনও কিছু দিয়েই পূরণ করা যাবে না।

নারী নির্যাতনের হার বেড়েছে অনেক। ধর্ষণকে থামানো যায়নি; বরং মাদ্রাসায় ছোট ছোট ছেলে শিশুদের ধর্ষণের ঘটনা সামনে এসেছে ন্যক্কারজনকভাবে। করোনার কারণে মানবিক সম্পর্কগুলো আজকে প্রশ্নের সম্মুখীন। পারিবারিক সম্পর্কগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মানুষে মানুষে দেখা সাক্ষাৎ কমে গিয়ে আমরা কেমন রোবটিক হয়ে যাচ্ছি। আবেগ, অনুভূতিগুলো কেমন ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। আশা করবো নতুন বছরে নারীরা স্বাধীনভাবে চলতে পারবে। ধর্ষণের মতো অপরাধের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আসবে। আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত হবে।
সর্বোপরি নতুন বছর আমাদের আবারও ফিরিয়ে দিক সেই চেনা-জানা বিশ্বকে। আমরা আবার হেসেখেলে মিলবো সকলে। সব হতাশা কেটে যাবে নতুন সূর্যে উদয়ের মাধ্যমে। দুর্নীতিবাজদের শাস্তি নিশ্চিত হবে। উন্নত দেশের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আইনের শাসন কায়েম, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ধর্ষণ, মৌলবাদের উত্থান ঠেকাতেই হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হোক আগামীর বাংলাদেশ গঠনের হাতিয়ার।

লেখক- কলামিস্ট

সর্বশেষ