নিঃশর্ত ভালোবাসা তোমাকে

সোর্স:

তুষার আবদুল্লাহ

নিঃশর্ত ভালোবাসা তোমাকে

নয়া বছরের দ্বিতীয় দিন সকালে এক তরুণী ক্ষুদ্র বার্তা পাঠিয়েছেন, ভালোবাসা নিয়ে লিখুন। ২০২১-এ কিছুই চাই না ভালোবাসা ছাড়া। তাকে পাল্টা লিখলাম- সবাইতো দেখছি লিখছেন, বলছেন নতুন বছরে তাদের নিজ নিজ কাজের জায়গার সম্ভাবনার দিকগুলোর কথা। শূন্যতা, ভুল শুধরে নেওয়ার কথা। সবাইকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। বেশিরভাগ মানুষের চাওয়া কোভিড-১৯ এর প্রতিশেধক। তরুণী লিখলেন, দেখেন কেউ কিন্তু লিখেনি বা বলেনি ভালোবাসা চাই কিংবা ভালোবাসা দেব। মানুষের কাছে ভালোবাসা যেন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। সকলে কেবল দখল করতে চায়। প্রতিহিংসাপরায়ণতা থেকে। সকলকে সে চায়, শাসিত হিসেবে। কোনও প্রতিবাদ নয়। শোষক সেই প্রিয় বুলি– তিনি সব সময়ে সঠিক। এটি শোষণ করার মন্ত্র। এই মন্ত্র না মানলেই, অন্যায় শাসন বা নির্দেশ চেপে বসে।

কেউ আমরা কারো কথা শুনতে চাইছি না। শ্রদ্ধা ভালোবাসা নেই, রাজনীতিতে। এক দলের প্রতি অন্য দলের নেই। নিজ দলের নেতা কর্মীদের মধ্যেও পারস্পরিক ভালোবাসা নেই। দৃশ্যমান সকল ভালোবাসায় শর্ত প্রযোজ্য। লেনদেনের স্বার্থ। লেনদেন নেই ভালোবাসাও ফুড়ুৎ। রাজনীতি থেকে এই ভালোবাসার এই রূপ নেমে এসেছে কাজের জায়গাতেও। স্বার্থ ক্ষমতা বুঝে ভালোবাসার পাত্র বদল হয়। আমি বললাম ভালোবাসার সঙ্গে তারল্য বা লেনদেনের সম্পর্ক আদিকালের। বাবা-মায়ের ভালোবাসাও নাকি স্বার্থ দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ? তরুণীর দিক থেকে জবাব এলো– তারপরও ভালোবাসার পাগলামীটা ছিল। পৃথিবীর অযুত মানুষ একে অপরকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে গেছে। ক্যালকুলেটর বা বাটখারা দিয়ে ভালোবাসা মাপা মানুষদের নিষ্ঠুর মানুষ বলেই জানতাম। এখন চারদিকে শুধু সেই নিষ্ঠুর মানুষেরা। যারা নিত্য রঙ বদলিয়ে ফেলে। এই গুনটি আগে রাজনীতির মানুষদের ছিল। এখন অফিস ঘর থেকে শোবার ঘর পর্যন্ত চলে এসেছে।

আমাকে তরুণী লিখলেন, আপনাদের মিডিয়াও তো এখন আর গণমানুষকে ভালোবাসে না। ক্ষমতার প্রেমিক সে । ক্ষমতা, প্রতাপ দেখে দেখে প্রেম করে। আজ যার ভালোবাসায় দেওয়ানা, কাল তার ক্ষমতা বা লেনদেনে ভাটা পড়লেই আর মুখ ফিরিয়েও তাকায় না। উল্টো পুরনো প্রেমিকের কতভাবে ক্ষতি করা যায়, সেজন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমি সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করি– কেন এখনও কত অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অসহায় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় গণমাধ্যম। বিপন্ন মানুষের স্বপক্ষে এখনও গণমাধ্যম সোচ্চার। ওই তরুণী হাসির ইমোজি পাঠিয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখেন– এগুলো রাজনৈতিক নেতা ও শিল্পপতিদের শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণের মতো দৃশ্যমান মানবিকতা। ওই ঘটনাগুলোর সঙ্গে কোনও ক্ষমতার যোগ থাকলে গণমাধ্যম দাঁড়ানোর সাহস পেতো না। কখনও কখনও গণমাধ্যমকে ওমন ভূমিকায় দেখে চমকে উঠি। ভাবি এমন সাহস ওরা পেলো কোথা থেকে? একটু একটু প্রেম জমতে থাকে ওই গণমাধ্যমের প্রতি। কিন্তু কিছু দূর যেতেই ভুল ভাঙে। দেখি অন্য এক ক্ষমতার হয়ে তার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই মিডিয়ার এই পরকীয়া প্রেম! তরুণী বললেন– দেখুন আপনারা এখন স্রেফ ম্যানেজার। সাংবাদিক নন। ওই পরিচয় অনেক আগেই হারিয়েছেন। জানতে চাইলাম, কার ম্যানেজার? তরুণী লিখলেন– ক্ষমতার। হতে পারে রাজনৈতিক ক্ষমতার, হতে পারে শিল্পগোষ্ঠীর।

অনেকক্ষণ বিরতি। দু’পক্ষই চুপচাপ। ভাবলাম তরুণীর বলা বা লেখার পালা শেষ। কোনও কারণে সকালবেলাটা ওর এলোমেলো ছিল। আমাকে লিখে ক্ষোভ বাষ্পিত করলো। আমরা তো এমনই। কখনও কখনও নিজের কাছেই নিজে অসহায় হয়ে পড়ি। সংশয়ে পড়ে যাই। আমি কি আমাকে ভালোবাসি, ভালোবাসতে শিখেছি? নিজেকেই যদি ভালো না বাসি অন্যকে ভালোবাসবো কেমন করে? এসব ভাবনায় চারপাশ ঘোলাটে মনে হয়। তখন কাউকে না কাউকে অবিরাম বলে যেতে থাকি মনের খেদ। এটা, নিজেকে ভালো রাখা বা ভালোবাসারই এক রূপ। জমে থাকা মেঘ বাষ্প করে দিয়ে নিজেকে সতেজ করে তোলা। মেয়েটি আবার ক্ষুদ্র বার্তা পাঠালেন, লাল হৃদয় চিহ্ন যুক্ত করে– খুব কঠিন কিছু না। সহজ সরল একটা দাবি।

২০২১ এ চলুন না আমরা শর্তহীন ভালোবাসা বিনিময় করি। আমি লিখলাম, খুব কঠিন। তরুণীর পাল্টা বার্তা– কঠিনকে ভালোবেসেই পৃথিবীকে, পৃথিবীর মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে সহজ করতে হবে। আমি হৃদয় চিহ্নিত ইমোজি পাঠিয়ে লিখলাম- কঠিনকেই ভালোবাসলাম । তবুও সহজ হোক মানুষ।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

সর্বশেষ