বিয়ের পর…

করোনা মহামারির কালে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহর দুটিতে ডিভোর্স আবেদনের সংখ্যা নাকি আগের চেয়ে বেড়েছে। করোনা যেখানে পরস্পরকে কাছে থাকার সুযোগ করে দিয়েছিল, সেখানে স্বামী-স্ত্রীরা দূরে সরে যেতে আবেদন করছেন! বিয়ের পরে স্বামী কিংবা স্ত্রী দুজনের মনেই যে অমূলক ভয় কাজ করে, সেটা হলো বিচ্ছেদ।

যে সুখের সন্ধানে দুজন নারী-পুরুষ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তা নানা কারণেই প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে পারে। বিশেষ করে অনাগত ভবিষ্যত্, শ্বশুরবাড়ির নতুন মানুষ, সেখানকার পরিবেশ, নিজের এত দিনের অভ্যাস, পছন্দ-অপছন্দ—এসব কিছু নিয়ে দ্বিধায় পড়েন অনেকেই। এ জন্য বিয়ের পরপরই বর-কনেকে কিছু বিষয়ে আগে থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

পরিবর্তনকে স্বাগত জানান

বিয়ের পর কনেরা বাবার বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি পাড়ি জমান। সেখানকার নতুন পরিবেশকে স্বাগত জানান। পরিবর্তনে ভয় পাওয়া থেকে দূরে থাকুন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার জানালেন, অমূলক ভয় পাওয়া যাবে না। বিয়ে একটি সামাজিক রীতি। যুগ যুগ ধরে দুটি মানুষ এই রীতি মেনে জীবন যাপন করে আসছেন। সেটাকে ভয় না পেয়ে সাহসিকতার সঙ্গে জয় করতে শিখুন।

মনে রাখুন, আপনি একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক। জীবনের সব সমস্যা ও সম্ভাবনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা আপনার আছে। আরেকটা বিষয় তো আছেই, আপনি এখন আর একা নন। যেকোনো সুবিধা-অসুবিধার কথা আপনার স্বামীর কাছে খুলে বলুন। দেখবেন ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হয়ে আসবে আপনার কাছে। অনুরূপভাবে বরেরও শ্বশুরবাড়ির ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব থাকা উচিত।

পারস্পরিক বোঝাপড়া

বিয়ের পর সুখী ও সুন্দর দাম্পত্যজীবন গড়তে বর-কনের পারস্পরিক বোঝাপড়া খুব জরুরি। মেখলা সরকারের মতে, বিয়ের রকমফের আছে। কেউ প্রেম করে বিয়ে করেন। কেউ পারিবারিক পছন্দে গাঁটছড়া বাঁধেন। আবার অনেক নারী-পুরুষ আছেন, যাঁরা নানা পারিপার্শ্বিক চাপে পড়েও বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হন। যেভাবেই বিয়ে হোক, এরপর সুখী হওয়া না-হওয়া পুরোপুরি স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব। কেউ বাইরে থেকে এসে তাঁদের সুখী করবে না। এ জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি পারস্পরিক বোঝাপড়া।

একে অন্যকে দোষারোপ নয়

একে অন্যের দোষ নয়, গুণগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। কোনো মানুষই ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। পারস্পরিক দোষারোপ দাম্পত্যজীবন বিষিয়ে তোলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মেহজাবিন হক বলেন, নবদম্পতি পূর্বপরিচিত হোক বা না হোক বিয়ের পরের জীবন কিন্তু আলাদা। এ জন্য আমি তোমাকে জেনেশুনেই বিয়ে করেছি কিংবা তুমি তো আমাকে জানতে চিনতে, তবে এখন কেন এসব প্রশ্ন করছ? আমাদের মধ্যে তো এমন কথা ছিল না—এই ধরনের প্রশ্নালাপ থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকতে হবে। যদি অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ হয়, তবে কেন তুমি আগে এ বিষয়ে আমাকে জানাওনি। আমি ভেবেছিলাম এমনটাই হবে—এই ধরনের প্রশ্নও তোলা যাবে না। দুজন মানুষ একসঙ্গে জীবন শুরু করলে সেখানে নানা প্রতিবন্ধকতা আসবে যাবে। এটা জীবনেরই নিয়ম। দুজন মিলেই সেসব বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে উঠতে হবে। সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন ঠিক করে সেই লক্ষ্যে স্বামী-স্ত্রীকে এগোতে হবে। সংসারে সুখী হওয়ার অন্যতম গুণ হচ্ছে দুজনের মধ্যকার মিল।

খোলামেলা হোন

মেখলা সরকার বলেন, বিয়ের পর বর-কনে দুজনের মধ্যে যত দ্রুত সম্ভব বন্ধু হওয়া জরুরি। দুজনের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের বাইরে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠলে একে অন্যকে বুঝতে সুবিধা হয়। তখন দুজন দুজনের কাছে মন খুলে একে অন্যের সুবিধা-অসুবিধার কথা বলতে পারেন। বর-কনের আয়-ব্যয় সম্পর্কে দুজন আগেভাগেই আলাপ করে নিন। এরপর সেই অনুযায়ী নিজেদের পারিবারিক আয়-ব্যয়ের হিসাব কষুন দুজন মিলেই। কোনো বিষয়ে কোনো সমস্যা হলে দুজন মিলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিন। কোনো সমস্যা ও সন্দেহ জিইয়ে রাখবেন না।

সামাজিক যোগাযোগে প্রতিযোগিতা নয়

বিয়ের আগে সংসারজীবন সম্পর্কে নারী ও পুরুষ দুজনের মধ্যেই অনেক স্বপ্ন থাকে। জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে, বর আসবে পালকি করে, দামি গয়নায় লাল টুকটুকে কনে সাজ, তারপর রংবাহারি রিসোর্টে হানিমুন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখিয়ে বেড়ানোর এই যুগে নবদম্পতিদের এ নিয়ে উচ্ছ্বাস ও আকাঙ্ক্ষারও কমতি নেই। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, পর্দায় আমরা যা দেখি তা থেকে বাস্তবের অনেক ফারাক। করোনা মহামারিতে যেখানে অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন কিংবা ব্যবসায় লোকসান গুনছেন, সেখানে সামাজিক মাধ্যমে সুখ দেখানোর প্রচেষ্টা থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকুন। বিয়ের পর সবার আগে অন্য পাশের মানুষটির সঙ্গে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করুন। তাঁর পছন্দ-অপছন্দ, ভালোলাগা-মন্দলাগার বিষয়ে জেনে নিন। এটা শুধু স্বামী কিংবা স্ত্রী নয়, দুজনের বেলায়ই প্রযোজ্য।

প্রাণ খুলে ভালোবাসুন

এই পৃথিবীতে মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার কাঙাল হয়। তাই দুজন দুজনকে প্রাণ খুলে ভালোবাসুন। ভালোবাসা এমনই যে যাঁকে যত ভালোবাসবেন তাঁকে তত ভালোবাসতে ইচ্ছা করবে, তত বেশি ভালোলাগা তৈরি হবে। এ জন্য ভালোবাসায় কার্পণ্য করবেন না। বিয়ের দিন-তারিখ মনে রাখুন, নির্দিষ্ট দিনটিতে প্রিয় মানুষটিকে উপহার দিন। উপহার যে দামি হতে হবে তা নয়, ছোট একটি লাল গোলাপই ভালোবাসার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে যথেষ্ট।

নিজের যত্ন নিন

বিয়ে তো হয়ে গেছে আর নিজের যত্ন কিসের! এই ভাবনা মনের মধ্যে চেপে বসতে দেবেন না। নিজেকে সব সময় আকর্ষণীয় রাখার চেষ্টা করুন। স্বাস্থ্যের পাশাপাশি নিয়মিত চুল ও ত্বকের যত্ন নিন। সংসার ও ভবিষ্যতের চিন্তার সঙ্গে নিজেকে ভুলে গেলে চলবে না। দুজনকে দুজনের কাছে আকর্ষণীয় করে রাখতে নিজেদের যত্ন নিন। সুস্থ শরীর ও সুন্দর মন থাকলে সংসারে অসুখ ঠাঁই পাবে না।

 

একে অন্যকে সময় দিন

চাকরি, ব্যবসা ও সংসারের চাপে নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার কথা ভুলে যাওয়া চলবে না। মেহজাবিন হকের মতে, যা-ই করুন না কেন, পাশের মানুষটার খোঁজ নিন। এমন নয় যে প্রতিদিনই তো ওর সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কথা হচ্ছে, আলাদা করে খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন কী! প্রতিদিন সকালে কিংবা বিকেলে দুজন একসঙ্গে কফি পান কিংবা ছাদে গল্প করুন। ছুটির দিনে রেস্টুরেন্টে খেতে যান, একসঙ্গে সংসারের কেনাকাটা করুন। মাঝেমধ্যে দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়াও মন্দ নয়।

অভিভাবকদের দ্বারস্থ হোন

সংসারে খুনসুটি, মান-অভিমান হওয়া খুব স্বাভাবিক। মাঝেমধ্যে হয়তো ভুল-বোঝাবুঝি থেকে নিজেদের মধ্যে ঝগড়াও হতে পারে। এগুলো মনের মধ্যে চেপে রাখবেন না। আপনার অভিভাবকদের জানান। মা-বাবা সব সময়ই সন্তানদের জন্য ছাতার মতো। তাঁদের কাছে সমস্যার কথা খুলে বলুন, পরামর্শ চান। তাঁরা নিশ্চয়ই আপনাদের ভুল-বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতে তত্পর হবেন

 

kaler katha

সর্বশেষ