প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কল্যাণে লিওনার্ড চ্যাশায়ার

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কল্যাণে লিওনার্ড চ্যাশায়ার

লিওনার্ড চ্যাশায়ার

লিওনার্ড চ্যাশায়ার (Leonard Cheshire) যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থা বিশ্বব্যাপী প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনের মান উন্নয়নে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অ্যাডভোকেসি ও গবেষণা খাতে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কর্মসংস্থান বা আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের মূল অংশীজনদের সঙ্গে অংশীদারি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থায়িত্ব ও মালিকানা বাড়ানোর ভিত্তিতে সংস্থাটি কাজ করছে।

লিওনার্ড চ্যাশায়ার ২০০৬ সাল থেকে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও জীবিকার উপায় বাড়ানোর উপযোগী প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে বিস্তৃত পর্যায়ে কাজ করছে। লিওনার্ড চ্যাশায়ার প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে।

LC কর্তৃক বাংলাদেশে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পসমূহ হলো:

● ইনোভেশন টু ইনক্লুশন (i2i), এফসিডিওর (FCDO) অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প। এটি একটি কনসোর্টিয়াম প্রকল্প।

● ইনক্লুসিভ এডুকেশন প্রোগ্রাম আন্ডার ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট, এফসিডিওর (FCDO) অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প। বাস্তবায়নে সহযোগিতা সংস্থা হিসেবে গণ উন্নয়ন কেন্দ্র

● গিভিং ভয়েস থ্রু পিকচার্স অ্যান্ড ওয়ার্ডস একটি গবেষণা প্রকল্প, যা হিউম্যানিটারিয়ান ইনোভেশন ফান্ডের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক ব্যক্তিকে দুর্যোগের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে এই সচেতনতা অপরিহার্য। বাংলাদেশে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ক্রিশ্চান এইড (Christan Aid) ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন কেপিকেএস (KPKS) যৌথভাবে কাজ করছে।

ইনোভেশন টু ইনক্লুশন (i2i) প্রকল্প

i2i প্রযুক্তিগত উদ্যোগভিত্তিক একটি তিন বছর মেয়াদি প্রোগ্রাম, যা বাংলাদেশ ও কেনিয়ার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরাসরি বেসরকারি কর্মসংস্থানে প্রবেশকে উন্নত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। ইউকে এইডের (UK Aid) আর্থিক সহায়তায় এবং প্যান ডিজঅ্যাবিলিটির দাতব্য সংস্থা লিওনার্ড চ্যাশায়ারের নেতৃত্বে একটি কনসোর্টিয়াম দ্বারা পরিচালিত, যার কার্যক্রম ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে এবং

যেখানে অংশীদারদের নানাবিধ এবং পরিপূরক গ্রুপকে একত্র করা হয়েছে, যার প্রত্যেকে পর্যাপ্ত দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করছে। লিওনার্ড চ্যাশায়ারের নেতৃত্বে এই কনসোর্টিয়াম রয়েছে (এলসি), বাংলাদেশ বিজনেস অ্যান্ড ডিজঅ্যাবিলিটি নেটওয়ার্ক, সিবিএম, ইউরোপিয়ান ডিজঅ্যাবিলিটি ফোরাম (ইডিএফ), আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন (এলএসটিএইচএম), গ্লোবাল ডিজঅ্যাবিলিটি ইনোভেশন হাব (জিডিআইএইচ), প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও বিশ্বব্যাংক।

এ প্রকল্পে ১০টি কনসোর্টিয়াম পার্টনারের পাশাপাশি আরও ৩টি দেশীয় সংগঠন (সিডিডি, এবিএফ এবং সিএসআইডি) এবং ১০টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন (ডব্লিউডিডিএফ, বি-স্ক্যান, ডিসিএফ, এনসিডিডব্লিউ, এনজিডিও, বিডিডিটি, এইচডিডিএফ, ডিডিআরসি, এইউডিসি, সিবিডিসিপিও) ওতপ্রোতভাবে কাজ করছে। i2i বাংলাদেশে ৫০০ নারী ও পুরুষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানে প্রবেশকে উন্নীত করবে, যার ৪০ শতাংশই থাকবেন প্রতিবন্ধী নারী। এর মাধ্যমে ৫০ হাজার পরিবার এবং কমিউনিটির সদস্যরা উপকৃত হবেন। আইটুআই (i2i)–এর কার্যক্রমের ফলাফলে দেখা যায়, ডিজিটাল ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তিকরণকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এই কর্মসূচিটি বাংলাদেশের শহর এলাকাগুলোতে (ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট) বেসরকারি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অর্থবহ অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কল্যাণে লিওনার্ড চ্যাশায়ার

প্রকল্পের সংক্ষিপ্তসার

আইটুআই (i2i) প্রকল্প প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে পাওয়া শিক্ষা প্রণয়ন, পরীক্ষা, যথার্থতা যাচাই ও প্রচারের লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে।

● বাংলাদেশের সাত হাজার নারী-পুরুষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে ।

● প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের (DPO) ১০টি সংগঠনের অ্যাডভোকেসির সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে।

● নারী-পুরুষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে অন্তত ৪০টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে।

● প্রায় ৫০ হাজার পরিবারের নারী-পুরুষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির আয় বাড়াতে পরোক্ষভাবে কাজ করছে।

● বিদ্যমান পরিস্থিতির উন্নয়নে বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের উপায় নির্দেশ করছে।

প্রত্যাশিত প্রভাব

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর নারী-পুরুষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডায় পেছনে পড়ে থাকবে না এবং জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য দূরীকরণে ভূমিকা রাখবে।

প্রত্যাশিত ফল

অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে জেন্ডার সমতার ইতিবাচক রূপান্তরের মাধ্যমে নারী-পুরুষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কল্যাণ নিশ্চিতকরণ।

ডিপিও: প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনের (DPO) সঙ্গে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের ভিত্তিতে আইটুআই (i2i) কাজ করছে।

বেসরকারি খাত: অন্তত ৪০টি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আইটুআই কাজ করছে, যাদের আগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়োগের কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান: প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়োগের অভিজ্ঞতা নেই, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর এমন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আইটুআই কাজ করছে।

টিভিইটি: আইটুআই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়োগে যোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক দক্ষতা অর্জনে টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভকেশনাল এডুকেশন ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (টিভিইটি)-এর সঙ্গে কাজ করছে।

ডেটা ও পরিসংখ্যান তৈরি: কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে আইটুআই কনসোর্টিয়াম সহযোগীরা ডেটা ও পরিসংখ্যান তৈরিতে নিয়োজিত ব্যক্তি, কার্যালয় ও মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সরাসরি কাজ করছে।

অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠান: আইটুআই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে নারী-পুরুষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বেতনসহ কর্মসংস্থানের সহায়ক প্রযুক্তি নিরূপণে পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কল্যাণে লিওনার্ড চ্যাশায়ার

আইটুআই ক্যারিয়ার অ্যাডভাইজর

বাংলাদেশে নারী-পুরুষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য আইটুআই ক্যারিয়ার অ্যাডভাইজর নামের নতুন ক্যারিয়ার পোর্টালের উদ্বোধন হয় ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর । লিওনার্ড চ্যাশায়ার আইটুআই প্রকল্পের আওতায় ‘আইটুআই ক্যারিয়ার অ্যাডভাইজর’ চালু করেছে। বাংলাদেশে চাকরি খোঁজার অন্যতম বৃহৎ অনলাইন পোর্টাল বিডিজবস ডটকম এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাকরি খোঁজার জন্য পুরোপুরি সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।

লিওনার্ড চ্যাশায়ারের সহযোগিতায় বিডিজবস অনলাইন পোর্টাল আরও বেশি সহজ ও প্রবেশগম্য হয়েছে। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ‘আইটুআই ক্যারিয়ার অ্যাডভাইজর’-এ নিবন্ধন করতে হবে যা বিডিজবসের ওয়েবসাইটের সঙ্গে যুক্ত। এ জন্য চাকরিপ্রার্থীকে তাঁর প্রোফাইল তৈরির জন্য দরকারি তথ্যগুলো দিতে হবে, যা বিডিজবসের সিভি ব্যাংকে জমা হবে। বিডিজবসে নিবন্ধিত চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ওই তথ্য দেখতে পারবে এবং তাদের উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচন করতে পারবে। এভাবে চাকরিপ্রার্থী প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাঁদের চাকরিদাতারা একজন অন্যজনকে সরাসরি খুঁজে পাবে।

বাছাইকৃত ই-লার্নিং প্রশিক্ষণ নির্দেশিকার লিংক এই পোর্টালে যুক্ত থাকবে। নিবন্ধিত প্রার্থীরা আইটুআই ক্যারিয়ার অ্যাডভাইজরের মাধ্যমে দক্ষতা ও ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানোর উপযোগী সহায়তা পাবে। আইটুআই ক্যারিয়ার অ্যাডভাইজরের www.i2i.net.bd সাইটে ৬টি ট্যাব রয়েছে, যেখানে চাকরিপ্রার্থী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তাঁদের পছন্দের কাজ অনুযায়ী তথ্য যোগ করতে হবে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কল্যাণে লিওনার্ড চ্যাশায়ার

উল্লেখ্য, i2i ক্যারিয়ার অ্যাডভাইজার চাকরিজীবী ও চাকরিপ্রত্যাশী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি ডিজিটাল পথ। এটি একটি সহজ নিবন্ধন ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া, যেখানে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তথ্য আদান-প্রদান করা যায়। এই প্ল্যাটফর্মটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মজীবনের পথচলায় বিভিন্নভাবে সহায়তা প্রদান করবে। যেমন:

● চাকরিবিষয়ক সেবা ও পরামর্শ

● চাকরির আবেদন ও সাক্ষাৎকার–বিষয়ক টিপস।

● উচ্চমানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ।

● প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ।

● চাকরি–সম্পর্কিত সংবাদ, ব্লগ ও তথ্য।

● চাকরির আবেদন করার পর তা অনুসরণে সহায়তা।

● চাকরিতে স্থায়িত্ব ও সন্তুষ্টির নিশ্চয়তা বিষয়ে সহায়তা।

● i2i–এর পার্টনার সিএসআইডির মাধ্যমে অনলাইন সহায়তা।

i2i ক্যারিয়ার অ্যাডভাইজার নিয়োগকর্তাদের জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন সম্ভাবনাময় পুল তৈরি, সমান সুযোগপ্রাপ্তির দিকনির্দেশনা প্রদান, প্রতিবন্ধিতা সমতাবিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, কর্মস্থলে সহায়তা ও সমস্যার সমাধান–সম্পর্কিত শিক্ষা উপকরণ সম্পর্কে তথ্য হালনাগাদ করে থাকে। নিয়োগদাতারা i2i ক্যারিয়ার অ্যাডভাইজার এবং বিডিজবস ডট কমের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনাময় এই পুলে চোখ রাখতে পারেন। i2i ক্যারিয়ার পরামর্শদাতা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দক্ষতা এবং সম্ভাবনাকে উৎসাহিত করে; অবহিত, অনুপ্রাণিত ও ক্ষমতায়িত করে; বড় স্বপ্ন দেখতে, সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নির্ধারণ করতে ও চাকরি জীবনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করে।

গবেষণা

লিওনার্ড চ্যাশায়ার আইটুআই (i2i) প্রকল্পের অধীনে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করেছে। এগুলো হচ্ছে:

১. প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ওপর কোভিড–১৯-এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা।

২. বাংলাদেশে ব্যাক্তি ও পরিবার পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনযাপনের বাড়তি খরচ সম্পর্কিত গবেষণা।

prothom alo

Top 8 জাতীয়